তারেক জমানায় ব্যবসায়ী গভর্নর !

বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের ১৪তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মহম্মদ মোস্তাকুর রহমানকে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাম্প্রতিকতম পালাবদল শুধু ক্ষমতার বদল নয়, এক গভীর নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথমে মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকার। তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের গঠন। এই ধারাবাহিকতায় দেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। আর সেই নতুন বাস্তবতার প্রথম বড় চমক হিসেবেই সামনে এসেছে বাংলাদেশের ব্যাঙ্কের গভর্নর পদে একেবারে ব্যতিক্রমী নিয়োগ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আর্থিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে একজন পেশাদার ব্যবসায়ীকে। আর তাতেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা, বিতর্ক ও প্রশ্ন। ব্যবসায়ীকে কি গভর্নর করা যায়?

বুধবারই আচমকা বাতিল করা হয় সদ্যনিযুক্ত গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ। তার পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের ১৪তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মহম্মদ মোস্তাকুর রহমানকে। পেশায় তিনি পোশাক শিল্প ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও ব্যবসায়ী সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর পদে বসেছেন। ঘোষণার পরদিনই বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টা নাগাদ বাংলাদেশ ব্যাঙ্কে পৌঁছে যান নতুন গভর্নর। তিনি বলেন, এসেছি আগে কাজ শুরু করি, তারপর কথা বলা যাবে। তাঁর এই সংযত মন্তব্যেই স্পষ্ট, দায়িত্বের গুরুত্ব ও বিতর্কের মাত্রা তিনি ভালোভাবেই অনুধাবন করছেন।

কে এই মোস্তাকুর রহমান?

তিনি কস্ট ম্যানেজমেন্টে এফসিএমএ ডিগ্রিধারী ও
দীর্ঘদিন পোশাক শিল্প ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত
নতুন নিয়োগ অনুযায়ী চার বছরের জন্য গভর্নর থাকবেন
অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না
ব্যবসা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখেই তাঁকে বাংলাদেশের দায়িত্ব সামলাতে হবে

এখানেই উঠেছে প্রশ্ন। ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা কি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। আইনগত দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশে এমন কোনও বিধি নেই যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে কোনও ব্যবসায়ী গভর্নর হতে পারবেন না। বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক অর্ডার ১৯৭২ অনুযায়ী, সরকার গভর্নর নিয়োগ করবে ও তাঁর মেয়াদ হবে চার বছর। প্রয়োজনে সরকার চাইলে সেই মেয়াদ বাড়াতেও পারে। একসময় গভর্নরের বয়সসীমা ৬৭ বছর নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগের সময় সেই সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়। আইনি দৃষ্টিতে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগে কোনও বাধা নেই। কিন্তু প্রশ্নটা আইনগত নয়, প্রশ্নটা নীতিগত, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দক্ষতা নিয়ে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, একজন ব্যবসায়ী স্বাভাবিকভাবেই মুনাফাকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরের দায়িত্ব মূলত আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। অন্যদিকে, সমর্থকদের বক্তব্য, বাস্তব ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকলে অর্থনীতির মাঠপর্যায়ের সমস্যা বোঝা সহজ হয়। যা নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এই নিয়োগকে তাঁরা দেখছেন একটি সাহসী ও নতুন ধারার সূচনা হিসেবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের শুরুর দিকেই এমন এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বার্তা দিচ্ছে যে, এই সরকার প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়ে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আগ্রহী। হাসিনার দীর্ঘ শাসনপর্বের পরে জনগণের মধ্যে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, এই নিয়োগ তারই প্রতিফলন কি না, তা তো সময়ই বলবে।
তবে এটুকু স্পষ্ট, ব্যবসায়ী গভর্নরের হাত ধরে বাংলাদেশের আর্থিক প্রশাসনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটাই প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই সিদ্ধান্ত কি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাবে, না কি ভবিষ্যতে নতুন বিতর্কের জন্ম নেবে? উত্তর লুকিয়ে আছে মোস্তাকুর রহমানের কাজের মধ্যেই। তাঁর নীতি, সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্বই নির্ধারণ করবে এই সাহসী পদক্ষেপ ইতিহাসে সফল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, না কি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। নতুন সরকারের প্রথম বড় চমক যে বাংলাদেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।