ব্যস্ত বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে এমন হামলায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটে দিনদুপুরে এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বুধবার দুপুরে মগরাহাট থানার হরিশংকরপুর এলাকার ভরত ঘোষ মোড়ে ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। নিহতের নাম আশাব্রত সর্দার। ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ব্যস্ত বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে এমন হামলায় আইনশৃঙ্খলা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার দুপুরে নিজের বিল্ডার্স সামগ্রীর দোকানে বসে ছিলেন আশাব্রত সর্দার। প্রতিদিনের মতোই দোকানের কাজকর্ম দেখাশোনা করছিলেন তিনি। অভিযোগ, সেই সময় আচমকাই মেঘনাদ সর্দার নামে এক ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র হাতে দোকানে ঢুকে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আশাব্রতের উপর এলোপাথাড়ি কোপ মারতে শুরু করে অভিযুক্ত। হামলার তীব্রতায় দোকানজুড়ে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু হয় এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অভিযুক্ত এতটাই আক্রমণাত্মক ছিল যে কেউ প্রথমদিকে এগিয়ে এসে বাধা দেওয়ার সাহস পাননি। আশেপাশের দোকানদার ও স্থানীয় মানুষ চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে আসেন। তখন রক্তাক্ত অবস্থায় দোকানের ভিতরে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় আশাব্রত সর্দারকে। হামলাকারী ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ।
গুরুতর জখম অবস্থায় দ্রুত স্থানীয়দের সহায়তায় আশাব্রত সর্দারকে মগরাহাট গ্রামীণ হাসপাতাল এ নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, শরীরের একাধিক স্থানে গভীর ক্ষত ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। নিহতের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনও আকস্মিক হামলা নয়; বরং সম্পূর্ণ পরিকল্পিত খুন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একটি দোকানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে আইনি বিবাদ চলছিল। ওই সম্পত্তি বা ব্যবসায়িক মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল বলে অভিযোগ। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সম্প্রতি সেই মামলায় জয়লাভ করেছিলেন আশাব্রত সর্দার। পরিবারের অভিযোগ, এই রায় মেনে নিতে পারেনি বিরোধী পক্ষ। সেই ক্ষোভ থেকেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
নিহতের আত্মীয়দের বক্তব্য, আশাব্রত সর্দারকে আগে থেকেই হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাঁকে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বা দোকানের দাবি ছেড়ে দিতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এই অভিযোগের সবদিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তকারীরা পুরনো আইনি নথি, জমি ও দোকান সংক্রান্ত বিবাদ এবং অভিযুক্তের সঙ্গে নিহতের সম্পর্কের দিকগুলো খুঁটিয়ে দেখছেন। মগরাহাট থানার এর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। এলাকা ঘিরে ফেলে প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। দোকানের ভিতর থেকে রক্তাক্ত মেঝে, ভাঙাচোরা সামগ্রী এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত মেঘনাদ সর্দারের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হামলার সময় ঠিক কী ঘটেছিল এবং অভিযুক্ত একাই ছিল নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত— সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গোটা মগরাহাট জুড়ে শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে একটি দোকানে ঢুকে এমন নৃশংস হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
আশাব্রত সর্দারের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁর পরিজনেরা। এখন সকলের নজর পুলিশের তদন্তের দিকে। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে শুধুই ব্যক্তিগত শত্রুতা, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কোনও ষড়যন্ত্র— সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে পুলিশ।