বিশ্বকাপে কানাডার মহাকাব্য!

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : কখনও কখনও ফুটবল এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয় যা শুধু একটি ম্যাচের ফল নয় হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। ফুটবল মানেই তো চমক। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই রাতেও ঠিক তেমনই এক নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী থাকল গোটা বিশ্ব। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল কানাডা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা না পেলেও হাল ছাড়েনি তারা। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে অধিনায়ক স্টিফেন এস্তাকিয়োর দুর্দান্ত গোলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করল কানাডা।
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথমবার আয়োজিত হচ্ছে রাউন্ড অফ ৩২। সেই ঐতিহাসিক প্রথম নকআউট ম্যাচেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিল কানাডা। গোটা ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে তারা। একের পর এক সুযোগ তৈরি করেও গোল পাচ্ছিল না। কখনও দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কখনও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস অসম্ভব সব সেভ করে কানাডাকে আটকে রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের দেয়ালে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয় কানাডা। ম্যাচের শুরু থেকেই কানাডার পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার। আক্রমণের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে ফেলা। সেই পরিকল্পনা সফলও হয়েছিল। শুরু থেকেই বল দখল, গতি এবং আক্রমণের ধার দিয়ে এগিয়ে ছিল কানাডা। তবে গোল করার মতো নিখুঁত ফিনিশিংয়ের অভাব বারবার তাদের হতাশ করেছে। জোনাথন ডেভিড নিজের সেরা ছন্দে না থাকলেও স্টিফেন এস্তাকিয়ো, নাথান সালিবা ও সতীর্থদের প্রচেষ্টায় কানাডার আক্রমণ থেমে থাকেনি।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয়। এস্তাকিয়োর কর্নার থেকে মোম্বিতো হেড করেন। গোললাইন থেকে অসাধারণ দক্ষতায় বল ফিরিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার। এরপর শটও রুখে দেন গোলরক্ষক উইলিয়ামস। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি প্রমাণ করছিলেন কেন তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম বড় ভরসা বলা হয়। এরপর আসে বিতর্কিত এক মুহূর্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার বক্সে কানাডার লারিয়াকে ট্যাকল করেন মুদাউ। কানাডার খেলোয়াড়রা পেনাল্টির দাবি তুললেও রেফারি তাতে সাড়া দেননি। ভিএআর পর্যালোচনাও হয়নি। রিপ্লেতে দেখা যায়। ট্যাকলের সময় পরিস্থিতি জটিল ছিল। রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে কানাডার সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ। দ্বিতীয়ার্ধেও ছবিটা বদলায়নি। কানাডা আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকাও পাল্টা আক্রমণে ভয় তৈরি করছিল। গোলের সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিল কানাডাই। ৬৫তম মিনিটে জোনাথন ডেভিডের নিশ্চিত গোলের মতো শট পা বাড়িয়ে আটকে দেন রনওয়েন উইলিয়ামস। এরপরও একাধিকবার দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাঁচান তিনি। মনে হচ্ছিল তার অসাধারণ পারফরম্যান্সেই হয়তো ম্যাচ গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে।
কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়। যখন সবাই অতিরিক্ত সময়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই বদলে গেল ম্যাচের চিত্র। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ডান দিক থেকে আসা বল পেয়ে যান স্টিফেন এস্তাকিয়ো। বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করে ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়িয়ে দেন কানাডার অধিনায়ক স্টিফেন এস্তাকিয়ো। দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক উইলিয়ামস এবার আর কিছুই করতে পারেননি। বিশ্বকাপে এটাই ছিল এস্তাকিয়োর প্রথম গোল আর সেই গোলই লিখে দিল কানাডার ইতিহাস।
পরিসংখ্যানেও কানাডার আধিপত্য স্পষ্ট ছিল। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার গোল লক্ষ্য করে একাধিকবার আক্রমণ করেছে ও বেশি সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও বল দখল ও পাসিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কিছুটা এগিয়ে ছিল। কিন্তু আক্রমণের শেষ মুহূর্তে কার্যকারিতার অভাব তাদের ভুগিয়েছে। অন্যদিকে কানাডা ধৈর্য ধরে নিজেদের সুযোগের অপেক্ষা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত কাজে লাগিয়েছে।
এই ম্যাচের আরেকটি বড় গল্পে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস। পুরো ম্যাচে একের পর এক অসাধারণ সেভ করে তিনি প্রোটিয়াদের লড়াইয়ে রেখেছিলেন। তার পারফরম্যান্স না থাকলে হয়তো ম্যাচের ফল আরও বড় ব্যবধানে হতে পারত। শেষ পর্যন্ত স্কোরবোর্ডে কানাডা ১, দক্ষিণ আফ্রিকা ০। অসাধারণ লড়াই করেও বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হলো প্রোটিয়াদের। আর কানাডা পেল এক ঐতিহাসিক সাফল্য। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় উঠে তারা নিজেদের প্রমাণ করল। কানাডার এই ঐতিহাসিক জয় নিয়ে আপনার মতামত কী। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় কানাডার এই পথচলা কতদূর যাবে বলে মনে করেন?