অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচকে চ্যালেঞ্জ

কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশ খারিজের আর্জি জানিয়ে এবার খোদ প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলা দায়ের।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : রক্ষাকবচ পেয়েও মিলছে না স্বস্তি। তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগের মাঝেই এবার নতুন করে আইনি চাপ। কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের দেওয়া রক্ষাকবচকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আইনি জটিলতা আরও বাড়ল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ। অন্যদিকে আগে ভাগে রক্ষাকবচ নিয়ে রেখেছিলেন তিনি। তাই এবার তাঁর বিরুদ্ধে আইনি রক্ষাকবচকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ । কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশ খারিজের আর্জি জানিয়ে এবার খোদ প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলা দায়ের।

মাস কয়েক আগে, যখন ফুটবল যুবরাজ লিওনেল মেসিকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই সময় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বর্ণাঢ্য আয়োজনকে কেন্দ্র করে চরম অব্যবস্থা এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। অব্যবস্থার জেরে আচমকাই গ্রেফতার হতে হয়েছিল মেসিকে ভারতে আনার মূল কারিগর তথা ক্রীড়া উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে। তবে ৪ মে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটতেই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায়। ক্ষমতা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস অপসারিত হতেই পাল্টা আইনি লড়াইয়ে নামেন শতদ্রু। নিজের গ্রেফতারি এবং যুবভারতীর অব্যবস্থার নেপথ্যে তৎকালীন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সরাসরি যোগ রয়েছে বলে দাবি করে তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দায়ের করেন শতদ্রু দত্ত।

গোটা ঘটনায় বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হল, কোথায় অরূপ? রক্ষাকবচ থাকা সত্ত্বেও কেনও পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করলেন না তিনি? শতদ্রু দত্তর দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পুলিশ অরূপ বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিকবার তলব করে। কিন্তু প্রতিবারই সেই আইনি তলব এড়িয়ে গিয়ে উল্টে কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের দ্বারস্থ হন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হওয়ার পর গ্রেফতারি এড়াতে টালিগঞ্জের প্রাক্তন বিধায়ক অরূপ আদালতে রক্ষাকবচের আর্জি জানিয়েছিলেন। কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য অরূপকে রক্ষাকবচ দেন। আদালতের নির্দেশ ছিল, তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে অরূপকে। একই সঙ্গে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় বিধাননগর পুলিশ কমিশনারকে। আদালত সেই সময় অরূপ বিশ্বাসকে পুলিশি গ্রেফতারি থেকে সাময়িক রক্ষাকবচ দিলেও, শুনানির সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি। আদালত স্পষ্ট ভাষায় অরূপ বিশ্বাসকে ভর্ৎসনা করে জানিয়েছিল যে, তদন্তে তাঁর যে ধরণের সহযোগিতা করা উচিত ছিল, তিনি তা করেননি। জানানো হয়,আদালতের অনুমতি ছাড়া রাজ্য ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। তাঁর পাসপোর্ট নিম্ন আদালতে জমা রাখতে হবে। অভিযোগ, হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চ স্পষ্ট করে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই বারবার পুলিশি হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছেন অরূপ বিশ্বাস।

রক্ষাকবচ থাকা সত্ত্বেও ১৫ জুনের হাজিরাও এড়ান অরূপ। তাঁকে রক্ষাকবচ দেওয়ার সিদ্ধান্তে অখুশি শতদ্রু। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, হাই কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যাবেন। সেখানে আশানুরূপ রায় না হলে সুপ্রিম কোর্টেও যাবেন। যেমন বলা তো তেমন কাজ। একক বেঞ্চের ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে এ বার ডিভিশন বেঞ্চে গেলেন মেসির অনুষ্ঠানের আয়োজক শতদ্রু। অরূপের বিরুদ্ধে তিনি থানায় এফআইআর করেন। শতদ্রুর দাবি, গত বছরের ডিসেম্বরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসিদের অনুষ্ঠানের জন্য মোট ৭০ হাজার টিকিট ছাপানো হয়েছিল। পদের ভার এবং প্রভাব দেখিয়ে তার মধ্যে ২২ হাজার টিকিট তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী একাই নিয়ে নিয়েছিলেন। শতদ্রুর অভিযোগ, ওই টিকিটগুলো তৎকালীন মন্ত্রী পরিচিতদের বিলি করার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও করেছেন। তা ছাড়া অনুষ্ঠানে যাবতীয় বিশৃঙ্খলার জন্য অরূপকে দায়ী করেছেন তিনি। পুরো ঘটনার তদন্ত চান মেসি-কাণ্ডের দিন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া শতদ্রু। এই সমস্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অরূপকে নোটিস দিয়েছিল পুলিশ। তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রথম বার হাজিরা এড়ান। তার পর গ্রেফতারির আশঙ্কা করে হাই কোর্টে গিয়ে রক্ষাকবচ পান। রক্ষাকবচের আগেই অবশ্য পুলিশের তৃতীয় নোটিস পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বাসের কাছে।

একদিকে তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ, অন্যদিকে রক্ষাকবচকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে মামলা। সব মিলিয়ে অরূপ বিশ্বাসকে ঘিরে আইনি চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এখন নজর কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের দিকে। সিঙ্গেল বেঞ্চের দেওয়া রক্ষাকবচ বহাল থাকে, নাকি নতুন কোনও নির্দেশ আসে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মেসি-সফর বিতর্কে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী পথ।