সেবাশ্রয় নিয়ে বিস্ফোরক মুখ্যমন্ত্রী

“একটি বড় স্ক্যাম সামনে এসেছে। সেটি হল ভাইপোর সেবাশ্রয় ক্যাম্পের স্ক্যাম।’

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : রাজনীতির মঞ্চে অভিযোগ এবং প্রত্যাঘাত নতুন নয়। যখন সেই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং জীবন। তখন বিতর্কের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবার ঠিক তেমনই এক নতুন ঝড় তুলেছে সেবাশ্রয় শিবিরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ। বিধানসভার অধিবেশনে এই ইস্যু নিয়ে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, সেবাশ্রয়ের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে, এমনকি বহু মানুষের জীবনও বিপন্ন হয়েছে।

বিধানসভায় আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে পরিচালিত সেবাশ্রয় স্বাস্থ্য শিবিরকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর কথায়, এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক অনিয়ম নয় বরং একটি বড়সড় কেলেঙ্কারি। বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “একটি বড় স্ক্যাম সামনে এসেছে। সেটি হল ভাইপোর সেবাশ্রয় ক্যাম্পের স্ক্যাম।’

পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে তিনি চিটিংবাজ ভাইপো বলেও উল্লেখ করেন ও স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রী জানান, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর থানাসহ একাধিক জায়গায় সেবাশ্রয় শিবির নিয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। বিধানসভায় তিনি কয়েকজন রোগীর ছবিও দেখান এবং দাবি করেন, ওই শিবিরে চিকিৎসার পর কারও হাত কেটে ফেলতে হয়েছে, কারও পা বাদ দিতে হয়েছে, আবার কেউ স্থায়ীভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন। এই ঘটনাগুলিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, এ তো খুনের মামলা। মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এই সমস্ত ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার আওতায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালের আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন বেআইনিভাবে বাইরে নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়াদেরও শিবিরে চিকিৎসার কাজে লাগানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছিল না। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। শুভেন্দু জানান, তদন্তে দিলীপ মণ্ডলের একটি গুদাম থেকে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলেও প্রশাসনের দাবি।

সেবাশ্রয় নিয়ে চিকিৎসক রাজীব বিশ্বাসের লেখা একটি চিঠিও বিধানসভায় পড়ে শোনান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ওই চিঠিতে শিবির পরিচালনা সংক্রান্ত একাধিক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে সেবাশ্রয় প্রকল্প চালু করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই শিবিরে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি ভিন্‌রাজ্য থেকেও বহু মানুষ সেখানে চিকিৎসার জন্য আসতেন। পরবর্তীতে বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রাম-সহ বিভিন্ন এলাকাতেও এই ধরনের স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করা হয়। তৃণমূল নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ফের ক্ষমতায় এলে দুয়ারে সরকারের আদলে স্বাস্থ্য পরিষেবাকেও মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।

নির্বাচনের পর থেকেই সেবাশ্রয়কে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। অভিযোগ ওঠে, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই স্বাস্থ্য শিবির পরিচালনা, বেআইনিভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার, তেজস্ক্রিয় যন্ত্রপাতির অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ, স্বাস্থ্যকর্মী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজে লাগানোর মতো একাধিক অনিয়ম হয়েছে। অনেক স্বাস্থ্যকর্মীর দাবি, প্রশিক্ষণ ও শংসাপত্র দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের শিবিরে নিয়ে যাওয়া হলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি।

শুক্রবার বিধানসভায় ফলতার বিজেপি বিধায়ক দেবাংশু পণ্ডাও বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কোথাও সরকারি জমি বা মাঠ দখল করে শিবির করা হয়েছে, কোথাও মাটির নিচে ওষুধ পুঁতে রাখা হয়েছে। আবার চিকিৎসার নামে নানা অনিয়ম হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই শিবিরগুলির কারণে স্থানীয় মানুষও সমস্যার মুখে পড়েছেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই শনিবার বিধানসভায় বিস্তারিত বিবৃতি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

তবে এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে। একদিকে রাজ্য সরকার কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। এখন নজর তদন্তের দিকে। দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।