সম্ভাব্য নাম ছাপিয়ে সামনে এল চার চমকপ্রদ মুখ। তাঁরা হলেন কোয়েল মল্লিক, বাবুল সুপ্রিয়, রাজীব কুমার এবং মেনকা গুরুস্বামী।
মাম্পি রায়, সাংবাদিক: রাজ্যসভা ভোটে চমক দেওয়াটা তাঁর রাজনৈতিক স্বভাবের অংশ। এ বারও তার ব্যতিক্রম হল না। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগে জল্পনা, গুঞ্জন, সম্ভাব্য নামের তালিকা ঘুরেছে রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবারও ম্যাজিক করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্ভাব্য নাম ছাপিয়ে সামনে এল চার চমকপ্রদ মুখ। তাঁরা হলেন কোয়েল মল্লিক, বাবুল সুপ্রিয়, রাজীব কুমার এবং মেনকা গুরুস্বামী।
তবে এ বারের তালিকায় একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে। অতীতে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যসভা প্রার্থী তালিকায় সংখ্যালঘু, মহিলা বা আদিবাসী প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ বার চার প্রার্থীকেই বেছে নেওয়া হয়েছে মূলত শিক্ষিত, শহুরে এবং উচ্চপর্যায়ের পেশাগত পরিচিতি সম্পন্ন সমাজস্তর থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটব্যাঙ্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, বিশেষত সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলে যার ইঙ্গিত মিলেছে, তারই প্রতিফলন এই কৌশলে।

কোয়েল মল্লিকের মনোনয়ন সেই দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। জনপ্রিয় অভিনেত্রী, পরিচ্ছন্ন ইমেজ, সুসংহত পারিবারিক পটভূমি— সবমিলিয়ে শহুরে শিক্ষিত বাঙালির গ্রহণযোগ্যতা সমাজে রয়েছে। তাঁর বাবা, প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক-এর সঙ্গে মমতার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কও রাজনৈতিক মহলে সকলের জানা। কয়েক মাস আগে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে মল্লিক পরিবারে সৌজন্য সাক্ষাৎ যে স্রেফ সাক্ষাৎ ছিল না, বরং তা ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা’ ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাবুল সুপ্রিয়র ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্তটি যথেষ্ট কৌশলী বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। নরেন্দ্র মোদী সরকারের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর বাবুলকে দলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। যদিও নির্বাচনী অঙ্কে প্রত্যাশিত ফল না মেলায় তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়। আসানসোলে প্রার্থী করা নিয়ে অনীহাও প্রকাশ করেছিলেন ঘনিষ্ঠ মহলে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে দিল্লির রাজনীতিতেই ফিরিয়ে দিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় সম্পদ হিসেবে বাবুলকে ধরে রাখতে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজ্যসভা প্রার্থী তালিকায় সবচেয়ে বড় হল চমক রাজীব কুমার। ডিজি পদে বর্ধিত মেয়াদ না পাওয়া, প্রকাশ্য বৈঠকে তিরস্কার, শোকজ— সবমিলিয়ে দূরত্বের বার্তা স্পষ্ট বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার-এর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়েরের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে ইঙ্গিত মিলছিল, রাজীব পুরোপুরি ‘একলা’ নন। অবশেষে রাজ্যসভার মনোনয়ন সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করল। অবসরের পর রাজনৈতিক সুরক্ষা ও কৌশলগত প্রয়োজন— দুটোই হাতে পেয়ে গেলেন রাজীব কুমার এখানে কাজ করেছে বলে মত অনেকের।

চতুর্থ নাম হল মেনকা গুরুস্বামী। মনোনয়ন জাতীয় রাজনীতির দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। রাজধানীর উচ্চশিক্ষিত, প্রভাবশালী মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৃণমূল নেতৃত্বের পক্ষে সম্পদ হতে পারে। সব মিলিয়ে, এ বারের প্রার্থিতালিকা শুধু চমক নয়— শহুরে মধ্যবিত্ত ও জাতীয় পরিসরে নতুন বার্তা দেওয়ার কৌশলও বটে।