প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি ককরোচদের

অকাল প্রয়াত পরীক্ষার্থীদের পরিবার পিছু ১ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : দেশ জুড়ে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং লাগাতার অনিয়মের মাশুল দিতে হচ্ছে এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে। গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১১ জন নিট পরীক্ষার্থী সিদ্ধান্ত বলে অভিযোগ। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে পড়ুয়াদের প্রাণহানির ঘটনায় এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হস্তক্ষেপ দাবি করল ককরোচ জনতা পার্টি।
ওই অকাল প্রয়াত পরীক্ষার্থীদের পরিবার পিছু ১ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ প্রধানমন্ত্রীকে একটি খোলা চিঠি লিখল সিজেপি।
দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা ওই চিঠিতে নিট পরীক্ষার্থীদের এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই সংকটের কারণে যে সমস্ত পরিবার তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, আপনার প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে সেই প্রতিটি পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
চিঠিতে দিপকে উল্লেখ করেছেন যে, মৃত তরুণ-তরুণীদের পরিবারগুলি আজ এক চরম এবং বহুমুখী আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে, তাদের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য এই পরিবারগুলির অনেকেই বিপুল অঙ্কের শিক্ষামূলক ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবস্থার ব্যর্থতায় সেই স্বপ্ন আজ নিষ্ঠুরভাবে চুরমার হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, আবার নতুন করে নিট পরীক্ষা নেওয়ার দিন ঘোষণা হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। যা এই বিধ্বংসী প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।


দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছে সিজেপি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষোভ উগরে দিয়ে অভিজিৎ দিপকে লিখেছেন, শিক্ষার্থীরা শুধু এটুকুই চায় যে, এই এতগুলো তরতাজা প্রাণ চলে যাওয়ার পেছনে কার কী দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেটা স্পষ্ট করা হোক। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোটি কোটি ছাত্র ও অভিভাবকদের মনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়। যদি এই ব্যবস্থার ব্যর্থতা দূর করতে এবং এর জন্য দায়ী নেতৃত্বকে বদলাতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ করা না হয়, তবে আমজনতার কাছে এই বার্তাই যাবে যে, প্রশাসন এই অরাজকতাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে।
গত বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে একের পর এক নিট পরীক্ষার্থীর জীবন শেষ করে দেওয়ার খবর সামনে আসছে। গত ৩ মে দেশজুড়ে প্রায় ২২ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী ৫৫১টি শহরে এই প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেছিলেন। পরীক্ষার পরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো অভিযোগ ওঠায় মূল পরীক্ষাটি বাতিল করতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। ২১ জুন পুনরায় পরীক্ষার দিন ধার্য করা হয়েছে। প্রথমবার পরীক্ষায় বসার পর আবার নতুন করে পরীক্ষা দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার্থীদের তীব্র মানসিক উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে সিবিআই যখন এই প্রশ্ন ফাঁসের তদন্ত চালাচ্ছে, ঠিক তখনই গুজরাত, তামিলনাড়ু, রাজস্থান, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটক থেকে পরীক্ষার্থীদের বেদনাদায়ক খবর এই বিতর্কের এক ভয়ঙ্কর মানবিক ট্র্যাজেডিকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

সম্প্রতি উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে এক ২৩ বছর বয়সি নিট পরীক্ষার্থী তাঁর নিজের বাড়িতেই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পড়াশোনায় অত্যন্ত ভাল হওয়া সত্ত্বেও নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে এক ধরনের তীব্র অসন্তোষ গ্রাস করেছিল তাঁকে। চন্দ্রবনি এলাকার বাসিন্দা ওই তরুণী দ্বাদশ শ্রেণিতে ৯৬.৭ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন এবং কলেজ টপারও ছিলেন। তিনি নতুন করে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আত্মহত্যার আগে তাঁর মধ্যে অবসাদ বা আচরণগত কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়নি বলেই জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, আমেদাবাদের নিউ রানিপ এলাকায় বুধবার ভোরে এক ১৭ বছর বয়সি ছাত্র একটি বহুতল আবাসনের ছয় তলা থেকে নিচে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। নিট থেকেই এই চরম সিদ্ধান্ত নাকি দুর্ঘটনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। তিনিও নতুন করে ২১ জুনের নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জন্মলগ্ন থেকেই শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষায় ব্যাপক খরচ এবং সার্বিকভাবে পড়ুয়াদের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব নিয়ে আন্দোলন করে চলেছে ককরোচ জনতা পার্টি। নিটে প্রশ্নফাঁসের পর থেকেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে সরব ককরোচ পার্টি। ওই দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন ককরোচরা। এমনকী দেশের অন্যান্য প্রান্তেও বিক্ষোভ প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন অভিজিৎ দিপকে। কিন্তু ধর্মেন্দ্র ইস্তফা দেননি। এমনকী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাঁকে বরখাস্ত করার কথা ভাবেননি।
২০ জুন শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে রয়েছে সিজেপির দ্বিতীয় বিক্ষোভ কর্মসূচি। আগামী ২৬ জুন কলকাতার শিয়ালদহতে কর্মসূচি রয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির। এই সংক্রান্ত একটি তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তবে আদৌ সেদিন অভিজিৎ দিপকে কলকাতায় আসবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। এর আগে ৬ জুন শতাধিক শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী দিল্লিতে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে সিজেপি দেশের বিভিন্ন শহরে পরীক্ষাসংক্রান্ত বিতর্ক ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। সেসব কর্মসূচিতেও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে উঠে আসে।