কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে জারি তাঁকে গ্রেফতারের আদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : প্রায় ছ’মাস ধরে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে বন্দি থাকার পর অবশেষে মুক্তি পেতে চলেছেন লাদাখের পরিবেশ আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে জারি তাঁকে গ্রেফতারের আদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যথাযথ বিবেচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে সরকারি বিবৃতিতে।
কেন্দ্রের দাবি, প্রায় ছ’মাস আটকের নির্দেশের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ইতিমধ্যেই কাটিয়ে ফেলেছেন ওয়াংচুক। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “লাদাখে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করে সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার পথ খুলে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যে সোনম ওয়াংচুকের আটকের আদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “লাদাখের মানুষের দাবি-দাওয়া এবং উদ্বেগ নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্র নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।” তবে লাগাতার বন্ধ ও বিক্ষোভের আবহে সমাজের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছে সরকার। তার প্রভাব পড়ছে পড়ুয়া, চাকরিপ্রার্থী, ব্যবসায়ী, পর্যটন শিল্প এবং গোটা অঞ্চলের অর্থনীতির উপর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছে, লাদাখের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একইসঙ্গে সরকারের আশা, হাই-পাওয়ারড কমিটি এবং অন্যান্য আলোচনার মাধ্যমে অঞ্চলের সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব হবে।
গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর সোনম ওয়াংচুককে আটক করা হয়। তার দু’দিন আগে লেহ-তে রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষার দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। সেই সংঘর্ষে চার জনের মৃত্যুও হয়। নিরাপত্তা কর্মী-সহ প্রায় ৫০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লেহ জেলার জেলাশাসকের নির্দেশে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে রাজস্থানের জোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
লাদাখে পরিবেশ রক্ষা এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক। ২০২৩ সাল থেকে তিনি লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের অধিকারের প্রশ্ন তুলে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মূল দাবি ছিল, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দিতে হবে।
গত বছর এই দাবিকে সামনে রেখে ৩৫ দিন ধরে অনশনও করেন তিনি। সেই আন্দোলন ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরবর্তীতে সহিংসতার ঘটনায় হতাশ হয়ে তিনি অনশন প্রত্যাহার করে জানান, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের বার্তা ব্যর্থ হয়েছে।
ওয়াংচুকের গ্রেফতারের আদেশ ঘিরে শুরু থেকেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল বিরোধী দলগুলি। তাদের অভিযোগ ছিল, আন্দোলন দমাতে কেন্দ্র অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ দিকে ওয়াংচুকের স্ত্রী তথা শিক্ষাবিদ গীতাঞ্জলি আংমো সুপ্রিমকোর্টে এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। শুনানির সময় শীর্ষ আদালতের কড়া প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল কেন্দ্রকে। বিশেষ করে যে বক্তৃতার ভিত্তিতে ওয়াংচুককে আটক করা হয়েছিল, তার অনুবাদ নিয়ে আদালত সন্দেহ প্রকাশ করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, তিন মিনিটের একটি বক্তৃতার প্রতিলিপি যদি সাত-আট মিনিট ধরে লেখা হয়, তবে সেখানে ‘এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি’ থাকতে পারে। সেই মন্তব্যের পর থেকেই বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
এই পরিস্থিতিতেই অবশেষে কেন্দ্রের তরফে ওয়াংচুকের মুক্তির সিদ্ধান্ত সামনে এল। লাদাখে চলমান আন্দোলনের ভবিষ্যত পথ কোনদিকে যায়, সেটাই এখন দেখার।