“রক্ষা করতে হবে সাধারণের ভোটাধিকার”,- স্পষ্ট বার্তা তৃণমূল সুপ্রিমোর। বিজেপির রথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারে মমতার কর্মসূচীও।

সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক : বাংলার রাজনীতি, অবস্থান-ধর্না এবং মমতা ব্যানার্জি। এ যেন একেবারে চেনা ছক। বারে বারে একাধিক দাবিতে পথে নেমেছেন তিনি। ধর্নায় বসে, নিজের দাবিকে মান্যতা পাইয়েছেন। এবার ফের। একই ঘটনা। ফের রাজপথে, নিজের দাবি সামনে রেখে, ধর্নায় বসছেন। রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, এই ধর্না মঞ্চ থেকেই বিজেপিকে আরও কোণঠাসা করবেন মমতা। ২০০৬ সালে, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে, ঠিক একই জায়গায় ধর্নায় বসেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। রাজ্যের পরিস্থিতি বদলেছে। তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী, এখন রাজ্যের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। তবে পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, মাঠে-ময়দানে নেমে রাজনীতির ধারা যে মমতার বদলায়নি, বদলায়নি আন্দলনের ঝাঁঝ, বারেবারে প্রমাণ করেছেন তা। ২০০৬-এর পর, ২০০৮, ২০১৯, একাধিকবার, নানা দাবিতে ধর্নায় বসছেন। এবার, ফের একবার। তবে এটা একদিনের বিষয় নয় বলেই মনে হচ্ছে। গত দু’দশকে বাংলার রাজনীতিতে যে ধারা তৈরি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাতে একদিনের ধর্না তাঁর অভিধানে কার্যত নেই। তাই আগে থেকেই এ ব্যাপারে সন্দেহ ছিল। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার সন্ধের পর থেকে দলের তরফ থেকে নেতাদের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে ৬ থেকে ৭ দিনের জন্য ধর্নাস্থলে যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি রাখতে। ভোটমুখী বাংলায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর, শাসক দলের সুপ্রিমোর শহরের বুকে ধর্নায় বসা, নিঃসন্দেহে বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবারেই প্রস্তুত মঞ্চ সজ্জা। মূল মঞ্চের দু’পাশে রয়েছে পরিসর। জানা গিয়েছে, মূলত তৃণমূল নেতা-নেত্রী, যাঁরা ধর্নায় থাকবেন দলের সুপ্রিমোর পাশে, তাঁদের জন্যই ওই অংশ ফাঁকা রাখা হয়েছে। কারণ, ধর্না কর্মসূচি ঘোষণার দিনেই অভিষেক বলেন, ‘তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতৃত্বরা উপস্থিত থাকবেন। দূর থেকে যাঁরা আসেন তাঁদের আমি এখনই আসতে বলব না। এসআইআর চলছে, আগামী ১০-১৫ দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা এবং আশেপাশের এলাকা থেকে সকলে আসুন। তবে নিজের এলাকা সামলে। বিজেপি রথে, তৃণমূল পথে। বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি তথাকথিত রথযাত্রা শুরু করার পর এই স্লোগানই আপ্তবাক্য হয়ে উঠেছে তৃণমূলের। অবশ্য একটু ভুল বলা হল, পথে নামার জন্য তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না। বঙ্গ রাজনীতিতে প্রকৃত অর্থে যদি কোনও স্ট্রিট ফাইটার থেকে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার পথে। সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ধর্নায়। ঠিক ২০ বছর আগে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলের যে ধর্না অনশন মঞ্চ থেকে বঙ্গে পরিবর্তনের সূচনাটা হয়েছিল, সেই একই মঞ্চে আবারও ধরনায় বসতে চলেছেন মমতা। এবারে লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন ‘বেআইনিভাবে’ বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র করছে, সেটা রুখে দেওয়া।মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে শুক্রবার দুপুর থেকে ধর্মতলাই ঠিকানা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে যে এলাকায় অনশনে বসেছিলেন সেদিনের বিরোধী নেত্রী, সেখানেই শুরু হবে অবস্থান। রাতেও ধরনাস্থলে থাকবেন তিনি। সিঙ্গুরের মতোই তাঁর এই কর্মসূচিতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এবং সামাজিক সংগঠনগুলিকে শামিল হতে আহ্বান করেছেন। ধর্না মানে তো শুধু বসে থাকা নয়। লাগাতার সেই মঞ্চ থেকে বক্তৃতা চলবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দিনের শেষে বা মধ্যে কোনও এক সময় তাঁর প্রতিবাদের বিষয়আশয় স্পষ্ট করে জানাবেন।সেই মেট্রো চ্যানেল, যেখানে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় ২০০৮ সালে টানা ২৬ দিন অনশনে বসেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেত্রী। আজ তিনি মুখ্যমন্ত্রী। আজও তিনি ধর্নায় বসছেন। এই সেই মেট্রো চ্যানেল, যেখানে ২০১৯ সালে তত্কালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে সিবিআই অভিযানের প্রতিবাদে গণতন্ত্র রক্ষার ডাক দিয়ে ধর্নায় বসেছিলেন মমতা। এও এক আশ্চর্য রাজনীতি। বিরোধী ও শাসকদল গুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। ১৯৯৩ সালের মমতার সঙ্গে বর্তমানের মমতার রাজনৈতিক লড়াইয়ের স্ট্র্যাটেজিতে কিন্তু বিশেষ বদল হয়নি। মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়! যে সব কর্মসূচি সাধারণত বিরোধীরা করে, সেই সব প্রতিবাদ এ রাজ্যে শাসকদলের নেত্রীও করেন। তিনি ‘পজিশনেও আছে, অপোজিশনেও আছেন’রাজনৈতিক দিক থেকে এই ডোরিনা ক্রসিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক ২০ বছর আগে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলের যে ধরনা অনশন মঞ্চ থেকে বঙ্গে পরিবর্তনের সূচনাটা হয়েছিল, সেই একই মঞ্চে আবারও ধরনায় মমতা আগামী বেশ কয়েকদিনের জন্য বলেই মনে করা হচ্ছে। এই যে গোটা রাজ্যে এত মানুষের নাম বাদ গিয়েছে বা আগামিতে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে ভোটাধিকার রক্ষায় এবার পথে নামা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই! অতএব, নিজের পরীক্ষিত ও সফল রাজনৈতিক হাতিয়ার ফের প্রয়োগ করতে চলেছেন মমতা। বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে, যখনই বাংলার মানুষকে চাপে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, তখনই মমতা পথে নেমেছেন। মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে শুক্রবার দুপুর থেকে ধর্মতলাই ঠিকানা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।