দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে সাতিসানের নাম ঘোষণা করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও কেরালার–দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী দীপা দাশমুন্সি।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : দীর্ঘ জল্পনা আর দফায় দফায় আলোচনা। মুখ্যমন্ত্রী সাংহাসনে বসবেন কে? এই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছিল কেরলের সাধারণের মনে। অবশেষে কেরলের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভিডি সাতিসানের নাম ঘোষণা করল কংগ্রেস। পরস্পরবিরোধী মত, রাহুল-মল্লিকার্জুন খাড়গে-সহ নেতাদের মধ্যে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় অবশেষে। এই পদ নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরমহলে ছিল দ্বন্দ্ব। সতীশন জানিয়ে দিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়া ছাড়া তিনি অন্য কিছুতে তিনি রাজি নন। এদিকে আবার সূত্রের খবর ছিল, কে সি বেণুগোপালকে মসনদে বসাতে চায় দিল্লি।তিরুবনন্তপুরমে কেরল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সদর দফতরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস বিধায়ক দলের বৈঠকে ভিডি সতীশন আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালেই কংগ্রেস সাংসদ কেসি বেণুগোপালকে নয়াদিল্লিতে রাহুল গান্ধির বাসভবনে পৌঁছতে দেখা যায়। তবে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে সাতিসানের নাম ঘোষণা করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও কেরালার–দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী দীপা দাশমুন্সি। উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন, মুকুল ওয়াসনিক ও জয়রাম রমেশ।

এবারের কেরল বিধানসভা নির্বাচনে টানা এক দশকের বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের বা এলডিএফ শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউডিএফ। ১৪০ আসনের কেরালা বিধানসভায় ১০২টি আসন পেয়ে অনায়াসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পার করে ইউডিএফ। এর মধ্যে এককভাবে কংগ্রেস জিতেছে ৬৩টি আসনে এবং তাদের সহযোগী দল ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএ) পেয়েছে ২২টি আসন। এককথায় এই নির্বাচন ছিল ৮০ বছর বয়সী পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন LDF-এর কাছে এক অগ্নিপরীক্ষা। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার পতনের পর কেরলই ছিল এখন ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে বামেরা ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু বিজয়ন সরকার এবার হ্যাট্রিক করতে পারলেন না। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়ন তার ধর্মদম আসনটি ধরে রাখতে পারলেও তার নেতৃত্বাধীন এলডিএফ জোট মাত্র ৩৫টি আসনে গুটিয়ে গেছে। এর মধ্যে সিপিআইএম ২৬টি এবং সিপিআই ৮টি আসন পেয়েছে। এছাড়া এই নির্বাচনে তিনটি আসন জিতে কেরালায় নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি ।
কেনও সাতিশনকেই বেছে নেওয়া হল।মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ভিডি সতীশন, কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল এবং জ্যেষ্ঠ নেতা রমেশ চেন্নিতালা।দলীয় সূত্রে আগে জানা গিয়েছিল, কংগ্রেস পরিষদীয় দল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেণুগোপালের নাম প্রস্তাব করেছিল। তবে বিধায়কদের একটি বড় অংশ সতীশনের পক্ষ নেয়। তাদের যুক্তি ছিল, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর কংগ্রেস ও ইউডিএফকে আবারও জনসমর্থনের পথে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সতীশন। শেষ পর্যন্ত সেই সতীশনকেই নেতৃত্বের দায়িত্ব দিল কংগ্রেস।ভিডি সতীশন একাধিকবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কেরালার এর্নাকুলাম জেলার পারাভুর কেন্দ্রের প্রতিনিধি। দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছেও তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।
এবার কেরলের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্কে একটু তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরি। সম্প্রতি শেষ হওয়া কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে যদি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেত, তবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছিলেন ৬১ বছর বয়সী সাতিসান। এরনাকুলাম জেলার কোচি জেলায় জন্মগ্রহণকারী সতীশন থেভারার সেক্রেড হার্ট কলেজে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি মহাত্মা গান্ধী ইউনিভার্সিটি ইউনিয়ন এবং ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে নিজের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হলেও, ২০০১ সাল থেকে তিনি ক্রমাগত পারাভুর আসন থেকে জয়ী হয়ে আসছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সাতিসান ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর জোর দেন এবং সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু উভয় ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকল্প হিসেবে ইউডিএফ-কে তুলে ধরেন। এছাড়া তার দেওয়া ‘টিম ইউডিএফ’ স্লোগানটি প্রচারণায় কর্মীদের উজ্জীবিত করতে মূল ভূমিকা পালন করে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং গুরুত্বপূর্ণ উপ-নির্বাচনগুলোতে জোটের ভালো ফলাফলের নেপথ্যে শক্তিশালী সংগঠক হিসেবে সতীশনের বিশেষ অবদান রয়েছে।

পেশায় আইনজীবী সাথীসন ২০০১ সালে পারাভুর কেন্দ্র থেকে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন। বিধানসভায় তাঁর তীক্ষ্ণ বক্তৃতা, তথ্যভিত্তিক আক্রমণ এবং রাজনৈতিক কৌশলের জন্য তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন।২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ইউডিএফের বড় পরাজয়ের পর তাঁকে বিরোধী দলনেতা করা হয়। প্রথমে তাঁকে আপসের প্রার্থী বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে তিনি সেই পদকে নিজের রাজনৈতিক উত্থানের মঞ্চে পরিণত করেন।সোনাপাচার কাণ্ড, এআই ক্যামেরা বিতর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণের মাধ্যমে তিনি কেরলে বামবিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।
কেরল কংগ্রেসে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ‘এ’ এবং ‘আই’ গোষ্ঠীর বাইরে থেকেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সেই কারণেই তরুণ বিধায়ক ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।যদিও দলের একাংশের অভিযোগ, তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা দেখান। তবে সমালোচকরাও মানছেন, বর্তমানে কেরল কংগ্রেসে জনসংযোগের দিক থেকে সাথীসনের জনপ্রিয়তা অনেকটাই এগিয়ে।