হুলি-গান-ইজমের কনসার্ট বাতিল ঘিরে বিতর্ক। আশাহত হয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট !
জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: বকুল তলায় ভিড়ের মধ্যে মেলা দেখতে গিয়ে আপনি মজা পেয়েছিলেন তো ? দিলীপ ঘোষের গরুর দুধে সোনা কিংবা শতরূপের দামি গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ানো- মজা দিয়েছিল আপনাকে। আপনি মজা পেয়েছিলেন। ফেসবুকে বিপ্লব হয়েছিল। প্রশংসা-সমালোচনা দুটোই জুটেছিল অনির্বাণদের। চটিচাটা তকমাও ধেয়ে এসেছিল। সব মিলিয়ে নিজের মস্তিতেই ছিলেন টিম হুলিগানিজম।
কয়েকদিন আগেই হইহই করে মার্কিন মুলুকে সুরেলা জাদুও ছড়িয়ে এসেছে হুলিগানইজম। অর্থাৎ পুজোর সময় বিদেশ বিভুঁইয়ে ব্যস্ত ছিলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কৃষানু ঘোষ, দেবরাজ ভট্টাচার্যরা। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। দেশে ফিরেই দুঃসংবাদ। ইউনিটি কনসার্ট ২০২৫-এর তালিকা থেকে বাদ হুলিগানইজম। কিন্তু হঠাৎ কেন এই কনসার্ট থেকে বাদ গেল অনির্বাণের দল। এর পিছনে কি কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে ? এমনই প্রশ্ন উঠছে।

তবে এই খবর পাওয়ার পরে একটি পোস্ট করা হয় হুলিগানিজমের তরফে। সেই পোস্টে বলা হয়েছে,’খবর পাইলাম ১ নভেম্বর ইউনিটি কনসার্ট ২০২৫-এর তালিকা হইতে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে হুলিগানইজম বাদ গিয়াছে। তাতে দুঃখ পাইবেন না শ্রোতাগণ। দুর্দান্ত সব ব্যান্ড-এর ডালি বিদ্যমান ৷ ফসিলস, লক্ষ্মীছাড়া, চন্দ্রবিন্দু এবং ইউফোরিয়া-র আগুনে অনুষ্ঠান জ্বলিয়া উঠিবে। তবে বন্ধুগণ, হুলিগানইজম-এর গান বন্ধ হইবে না।’ পোস্টে আবার নাম না করে কিছুটা খোঁচা দিয়ে ব্যাঙ্গের সুরে বলা হয়েছে, ‘ইহার পিছনে কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি বা কারণ কখনই খুঁজিবেন না ৷ আমরা আগেই বলিয়াছি, পশ্চিমবঙ্গ অ-রাজনৈতিক রাজ্য ও সাংস্কৃতিক উদারতায় বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছে।’ এই পোস্ট দেখে কি মনে হচ্ছে আপনার ? কি বুঝলেন আপনি ? নাকি বুঝলেন কি বুঝলেন না। আরও একবার বলছি, রাজনৈতিক অভিসন্ধির শিকার কি অনির্বানরা।
অনির্বাণরা অভিসন্ধির শিকার কিনা সেটা তো সময় বলবে। আর অবশ্যই বিচার করবেন আপনারা-জনতা-জনার্দন। কিন্তু একটা বিষয় কি লক্ষ্য করেছেন। কোন বিষয়টা বলুন তো ? আরে যে পোস্ট করা হয়েছে হুলিগানিজমের তরফে সেই পোস্টটা। একটু অভিনবত্ব খুঁজে পাচ্ছেন কি ? ভালো করে দেখুন বুঝতে পারবেন। হাতের পাঁচটি আঙুল থেকে পাঁচটি সুতো ঝুলছে। আর সেই সুতোর মাথায় ঝুলে রয়েছে ক্যান-সেল-সং-বাদ। আপনার মনে হলো না এটা কোনও বার্তা হতে পারে। আমার কিন্তু মনে হয়েছে এটা একটা বার্তা। আমার মনে হচ্ছে বিপদেও এক সুতোয় বেঁধে থাকার বার্তা দিচ্ছে হুলিগানিজম।
দেখুন, একেবারে সোজাসাপটা ভাষায় আমার-আপনার কথা বলে হুলিগানিজম। রাজনৈতিক স্যাটায়ার থেকে সমকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা তাঁদের গানের বিষয়বস্তু। কখনও দিলীপ ঘোষ, কখনও কুণাল ঘোষ, তো কখনও আবার শতরূপ ঘোষ তাঁদের গানের বিষয়বস্তু। SIR থেকে NRC…আসে সব প্রসঙ্গই। আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকৃষ্ণ দেব, বিবেকানন্দ থেকে ডোনান্ড ট্রাম্প, জুকেরবার্গ। অর্থাৎ বাংলা থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সব মিলেমিশে একাকার অনির্বাণদের গানে-কথায়।
তবে হুলিগানিজমের অনুষ্ঠান বাতিলের খবরে আশাহত হয়েছেন তাঁদের অনুরাগীরা। পোস্টে অনেকে অনেক মন্তব্য করেছেন। যেমন কেউ লিখেছেন, ‘ভালো কিছু করতে গেলেই, সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। সেটা অতীতেও হয়েছে আর এখন তো ট্রেন্ড ৷ শ্রোতারা আপনাদের সঙ্গে আছে। এগিয়ে চলুন।’ আবার কেউ লিখেছেন, ‘বাদ দেওয়া মানেই পথটা সঠিক। সেই সোনার কেল্লার মতো, গাড়ি যখন কাঁচের টুকরোতে বিদ্ধ হয়ে যাত্রাপথ নষ্ট হয়েছিল। তখন ফেলুদা বলেছিল। এটাও একই। সুতরাং ভয় না পেয়ে এগিয়ে চলুন। সঙ্গে আছি।’ আবার কারও মতে, ‘বাংলায় স্বাধীন চিন্তা ভাবনাকে দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সর্বদাই। সেটা রাজনৈতিক বা অ-রাজনৈতিক যে ক্ষেত্রেই হোক। যে রাজ্য এক সময় এত নেতা, শিল্পী, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক উপহার দিয়েছে দেশকে, সেটা আজকের দিনে সমীকরণে মেলানো কঠিন। ফলে এখনও আমাদের এখনও পড়ে থাকতে হয় অতীতেই। রবীন্দ্রনাথ বা সত্যজিৎ রায়ের পদচিহ্ন আঁকড়ে ধরে থাকতে হয় আমাদের। নিজের থেকে কিছু সৃষ্টি করা যায় না। আর করতে দেওয়াও হয় না। কেউ নতুন কিছু করতে গেলে পদে পদে বাধা। আসলে বর্তমান সমাজের কঙ্কালসার চেহারা দেখে আঁতকে উঠছেন তো অনেকে।’ অনুরাগীদের একাংশের বক্তব্য, ‘ভাল কিছু করতে গেলে বাধা তো আসবেই। সমালোচনা যত বাড়ে, ততই বুঝতে হয় আপনি ঠিক পথে আছেন।’ আরেকজনের ভাষায়, ‘হুলিগানইজম মানে প্রতিবাদের সুর। ওদের গান থামানো যায় না।’
১ নভেম্বর গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম সাক্ষী থাকতে চলেছে রকিং সন্ধ্যার। গানে গানে সকলে বাঁধা ভাঙতে প্রস্তুত লক্ষ্মীছাড়া, ফসিলস, ইউফোরিয়া ও চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ডে। দুপুর ২টো থেকে শুরু হওয়ার কথা ইউনিটি কনসার্টের অনুষ্ঠান। চার ঘণ্টার শোয়ে পারফর্ম করবে মোট চারটি ব্যান্ড। টিকিটের মূল্য শুরু হয়েছে ৬৯৯ টাকা থেকে। যদিও কনসার্ট আয়োজকদের তরফে এখনও পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া আসেনি।
আর শো বাতিলের সংবাদে আশাহত হয়ে সমাজমাধ্যমে আগেই পোস্ট করে হুলিগানিজম। আর পোস্টের শেষে, বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসাবে লেখা রয়েছে, ‘এর পিছনে কোনও রাজনৈতিক কারণ বা অভিসন্ধি কখনোই খুঁজবেন না। আগেই আমরা বলেছি, পশ্চিমবঙ্গ অ-রাজনৈতিক রাজ্য এবং সাংস্কৃতিক উদারতায় বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।’