এবার আরও সস্তা রান্নার গ্যাস ?

কেন রান্নার জ্বালানি হিসেবে অন্য জ্বালানির উপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্র?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছে, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরবরাহে সমস্যার খবরও সামনে আসছে। এরই মধ্যে এলপিজির বিকল্প হিসেবে বড় পরিকল্পনার পথে কেন্দ্র। যদি সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোয়, তাহলে আগামী দিনে দেশের রান্নাঘরে এলপিজির পাশাপাশি জায়গা করে নিতে পারে নতুন জ্বালানি। কেনই বা এবার রান্নার জ্বালানি হিসেবে অন্য জ্বালানির উপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্র? আর সত্যিই কি এতে কমবে সাধারণ মানুষের খরচ?

দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে রান্নার গ্যাস সংকটের খবর সামনে আসছে। সরকারের দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। দেশে রান্নার গ্যাসের কোনও ঘাটতি নেই। দিনে দিনে বাড়ছে রান্নার গ্যাসের দাম। বাড়ছে জ্বালানির খরচ। উধ্বগগণে মধ্যবিত্তের চিন্তার ভাঁজ। এমন অবস্থায় কেন্দ্রের আরও বড় পরিকল্পনা। দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রকাশিত রিপোর্ট কীসের উল্লেখ? এবার কি তবে এলপিজির থেকেও সস্তায় মিলবে রান্নার গ্যাস?

এত কিছু প্রশ্নের ভিড়ে যে নামটা বেশি করে উঠছে, তা হল ইথানল। কেরোসিন, কাঠ বা কয়লার তুলনায় ইথানল সম্পূর্ণ পরিষ্কারভাবে জ্বলে। এতে কার্বন মনোক্সাইড এবং অপূর্ণ দহন থেকে তৈরি ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন প্রায় থাকে না বললেই চলে। ফলে ঘরের ভিতরের বাতাসও তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার থাকে। মূলত আখ ও ভুট্টা থেকে তৈরি হয় ইথানল। ফলে এর চাহিদা বাড়লে দেশের আখ ও ভুট্টা চাষিদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। রান্নার জ্বালানি হিসাবে ইথানল ব্যবহার করার অন্যতম কারণ হল অতিরিক্ত ইথানল। বিগত কয়েক বছর ধরেই ক্রুড তেলের উপরে নির্ভরশীলতা কমাতে পেট্রোলে ইথানল মেশানো হচ্ছে। বর্তমানে পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো হয়, যা ই২০ হিসাবে প্রচলিত। তবে বর্তমানে ভারতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ইথানল উৎপাদন হচ্ছে। সেই জন্যই ইথানল জ্বালানি আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কী কী সুবিধা রয়েছে।

ভারতীয় বাড়িতে বড় পরিসরে ইথানল স্টোভ চালু করতে গেলে সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে। কারণ ইথানলের মতো অত্যন্ত দাহ্য তরল জ্বালানি ঘরের ভিতরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে। ভারত তার অপরিশোধিত তেল ও LPG-র প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রয়োজন বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যায়। ইথানলের ব্যবহার বাড়লে এই আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে।

গত এক দশকে ভারত ইথানল ব্লেন্ডিং প্রোগ্রামে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে পেট্রোলে ইথানলের মিশ্রণ ছিল মাত্র ১.৫ শতাংশের আশপাশে, সেখানে সরকারি নীতি ও বায়োফুয়েল পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের ফলে ২০২৫ সালে সেই হার প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এতদিন পর্যন্ত সরকারের মূল জোর ছিল যানবাহনে ইথানলের ব্যবহার বাড়ানোর উপর। তবে এবার রান্নার জ্বালানি হিসেবেও এর ব্যবহার নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ভারতের ক্রমবর্ধমান বায়োফুয়েল মিশনে এটিকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই স্টোভ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ স্বদেশি। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হল, স্টোভটি সরাসরি ইথানলে নয়, বরং ইথানলের সঙ্গে জল মিশিয়ে কাজ করে। এই মিশ্রণ থেকে পরিষ্কার কুকিং ফ্লেম তৈরি হয়। ফলে এটি প্রচলিত LPG সিলিন্ডার ও কেরোসিনের তুলনায় নিরাপদ, কম খরচের এবং দূষণমুক্ত বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।

পেট্রোলে ইথানল মেশানোর পর এবার কেন্দ্রের আরও বড় পরিকল্পনা। এবার বায়োফুয়েল ব্যবহার করা হবে রান্নাঘরেও। এলপিজি-র পাশাপাশি এবার ইথানল কেও রান্নার জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা কেন্দ্রের। দ্য ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের তরফে একটি নীতি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে ইথানলকে রান্নার জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করার। বর্তমানে ভারতে বিপুল পরিমাণ ইথানল মজুত রয়েছে। তাই পরিবহনের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইথানল ব্যবহার করার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে এই পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। ইথানল-ভিত্তিক রান্নার জ্বালানি চালু করতে হলে নিরাপত্তা বিধি, স্টোভের মান নির্ধারণ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলার মতো একাধিক বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইথানলের দাম, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং এলপিজির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কতটা কার্যকর হবে, সেটাও সময়ই বলে দেবে।

তবুও কেন্দ্রের এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। একদিকে যেমন কমতে পারে আমদানি নির্ভরতা, তেমনই কৃষকরাও পেতে পারেন নতুন বাজার। আর যদি সত্যিই কম খরচে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ইথানল মানুষের রান্নাঘরে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এলপিজির পাশাপাশি দেশের কোটি কোটি পরিবারের ভরসা হয়ে উঠতে পারে এই নতুন বায়োফুয়েল।