অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান বন্ধ করতে এমন ভাবনা বিএসএফের।

শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক : বহু জায়গায় কাঁটাতার নেই। কোথাও আবার একটা সরু খাল বা নদী ভারত-বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণ করছে। বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন করে চিন্তা বাড়িয়েছে বিএসএফ-র। এবার সীমান্ত পাহারা দিতে নতুন এক উপায় বার করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
প্রাচীনকালে দুর্গ বা প্রাসাদের চারপাশ সুরক্ষিত রাখতে পরিখা খনন করে তাতে কুমির ছেড়ে দেওয়ার গল্প আমরা ইতিহাসে পড়েছি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেই ঐতিহাসিক কৌশলই বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দুর্গম নদীপথ, জলাভূমি রক্ষা ও অনুপ্রবেশ রুখতে এবার কুমির এবং সাপের মতো সরীসৃপ মোতায়েন করার কথা ভাবছে বিএসএফ।
বিএসএফ সূত্রে খবর, শুধু অনুপ্রবেশই নয়, এই ব্যবস্থায় ওই সব এলাকা দিয়ে চোরাচালানও বন্ধ হতে পারে। কমতে পারে অপরাধমূলক অন্যান্য কাজও। বিষয়টি এখনও চিন্তাভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। কোনও রকম সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়নি। আরও খবর গত ২৬ মার্চ বিএসএফের সদর দফতর থেকে ফিল্ড লেভেলের সব ইউনিটকে এক মেসেজ পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র এই ভাবনা বাস্তবায়িত ও কার্যকর করা সম্ভব কিনা, তা যেন খতিয়ে দেখা হয়।
বলা হয়েছে, কোন কোন এলাকায় এটা করা সম্ভব, তা সরেজমিনে দেখে চিহ্নিত করতে হবে।
বিএসএফ সূত্রের খবর, বিষয়টি এখনও চিন্তাভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা, তা দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তা রূপায়িত করা যাবে কিনা, তা এখনও অনিশ্চিত।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিস্তৃতি ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এই সীমান্তের মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার অংশে নদী ও জলাভূমি রয়েছে। বিএসএফের দাবি, কড়া নজরদারি সত্ত্বেও ওই অঞ্চল দিয়ে অনুপ্রবেশ যেমন ঘটে, তেমনই চলে চোরাচালান।
এধরনের অবৈধ কাজকর্ম ঠেকাতে তাই শীর্ষ মহলের ভাবনায় ঘোরাফেরা করছে সরীসৃপ ছাড়ার বিষয়টি। মনে করা হচ্ছে, বাঘের ভয়ে যেমন জঙ্গলে প্রবেশ ঠেকানো যায়, তেমনই কুমির ও সাপের ভয়ে জলাভূমি পারাপার কমানো যাবে।
এই পরিকল্পনার সঙ্গে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অদ্ভূত মিল পাওয়া গিয়েছে। ফ্লোরিডায় এলিগেটর আলকাট্রাজ নামে একটি ডিটেনশন সেন্টারের চারপাশে প্রাকৃতিকভাবেই কুমির ও অজগর থাকে। যা বন্দীদের পালানো রোধে কাজ করে। ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে রিও গ্র্যান্ডে নদীতেও এমন ব্যবস্থা করার কথা বলেছিলেন। যদিও পরে তিনি তা হাঁসির ছলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারত অবশ্য বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছে।
কেন এই ব্যবস্থা? বিএসএফ বর্তমানে জনবল সংকট ও পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার ২০০ কিলোমিটার সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত ২ লক্ষ ৬৫ হাজার কর্মীর একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা নির্বাচনী দায়িত্বের মতো অ-সীমান্তবর্তী কাজে ব্যস্ত রয়েছে। এছাড়া বাহিনীর প্রায় ২০ শতাংশ সদস্যের বয়স ৪৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে এবং আরও ২০ শতাংশ সদস্য শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট নন। এই জনবল সংকট মেটাতেই প্রকৃতিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে।
যদিও সূত্রে খবর, এই ভাবনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন সরীসৃপ সংগ্রহ। কীভাবে কুমির ও সাপ সংগ্রহ করা হবে, সেটা যেমন বড় প্রশ্ন, তেমনই তার প্রভাব ওই সব অঞ্চলের মানুষের ওপর কতটা পড়বে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশে ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে একটা বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার। পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতে প্রভাব বিস্তারে, বিশেষ করে অসম ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা ধরে রাখা ও ক্ষমতা দখলের তাগিদে বিজেপি বারবার অনুপ্রবেশকে বড় ইস্যু করে তুলেছে। দুই রাজ্যেই এবারের ভোটে অনুপ্রবেশকারী বা ঘুষপেটিয়া বড় ইস্যু।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা অসম নয়- মেঘালয়, ত্রিপুরা, বিহার ও ঝাড়খন্ডেও বিজেপি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে সরব হয়েছে। বিহার ও ঝাড়খন্ডের ভোটে তারা বলেছে, ঘুষপেটিয়ারা রাজ্যের অর্থনীতিকে শেষ করে দিচ্ছে। জনবিন্যাসে বদল ঘটিয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন দেশজুড়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তার অন্যতম লক্ষ্য অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা। অথচ বিহারে কত অনুপ্রবেশকারীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কত রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই হিসাব নির্বাচন কমিশন এখনও দেয়নি। বাংলাতেই সেই খতিয়ান পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিএসএফ-কে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর আওতায় ই-বর্ডার বা ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। তবে ভারত-বাংলাদেশে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে এখনও প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার এলাকা বেড়াহীন। এর মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা নদী ও জলাভূমির কারণে বেড়া দেওয়ার অনুপযুক্ত।
মূলত এই এলাকাগুলোতেই অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে সরীসৃপ মোতায়েনের এই বিকল্প ও কঠোর পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এখন দেখার সীমান্তে সাপ-কুমির ছাড়া হয় কিনা, ছাড়া হলেও অনুপ্রবেশ কমে কিনা তাও আতসকাচের নীচে থাকবে কেন্দ্রের।