ক্রিপ্টোকে ঘিরে বেআইনি লেনদেন ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। অর্থপাচার, এসকর্ট সার্ভিস সহ বিভিন্ন বেআইনি কাজে ক্রিপ্টো লেনদেন বেড়েছে ৮৫%।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মার্কিন ব্লকচেন বিশ্লেষক সংস্থা Chainalysis-এর সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সন্দেহভাজন মানবপাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ক্রিপ্টো লেনদেন বেড়েছে অন্তত ৮৫ শতাংশ। সংস্থার হিসেব, চলতি বছরে শুধু সন্দেহভাজন পাচার-সংক্রান্ত নেটওয়ার্কগুলির ক্ষেত্রেই প্রকাশ্য ব্লকচেনে শত-শত মিলিয়ন ডলারের লেনদেন ধরা পড়েছে।
রিপোর্টে বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের নাম উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই অঞ্চলে ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ড’, অবৈধ জুয়া ব্যবসা এবং চিনা ভাষাভাষী অর্থপাচার চক্র একসঙ্গে কাজ করছে। এইসব চক্র ক্রিপ্টো মুদ্রাকে হাতিয়ার করে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ও মানবপাচারের জাল বিস্তার করছে।
চিহ্নিত তিনটি ক্ষেত্র বিশেষ ভাবে উদ্বেগের— আন্তর্জাতিক এসকর্ট ও দেহব্যবসা পরিষেবা, শ্রমিক নিয়োগকারী এজেন্টদের মাধ্যমে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাঠানো শ্রমিক এবং শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত কনটেন্ট (CSAM) বিক্রেতা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক এসকর্ট পরিষেবার ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের লেনদেন হয়েছে। প্রায় অর্ধেক লেনদেনই ১০ হাজার ডলারের বেশি। কিছু ‘ভিআইপি প্যাকেজ’-এর মূল্য ৩০ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে।
চেনালিসিসের গবেষকেরা জানিয়েছেন, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়মিত টাকার লেনদেন ধরা পড়েছে। অর্থাৎ পাচারচক্রের নেটওয়ার্ক আর কোনও একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। তা কার্যত বিশ্বজোড়া। যোগাযোগ ও লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম— বিশেষ করে Telegram. সেখানেই বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, শিকার সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং অর্থ লেনদেনের বিষয়টিও চালানো হচ্ছে।
অর্থপাচারের ক্ষেত্রে ‘স্টেবলকয়েন’ এবং চিনা ভাষাভাষী মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্কের ব্যবহার বেড়েছে। রিপোর্টে দাবি, ২০২৫ সালে এ ধরনের অর্থ পাচারের মাধ্যমে অন্তত ১৬.১ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ ক্রিপ্টো লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে। তদন্তকারীদের দাবি, কিছু এজেন্ট ১ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ফি’ নিচ্ছে শ্রমিকদের কম্বোডিয়া ও মায়ানমারের মতো দেশে পাঠানোর জন্য। সেখানে পৌঁছে বহু শ্রমিককে জোর করে অনলাইন জালিয়াতির কাজে নামানো হচ্ছে। একাধিক ক্ষেত্রে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া ও নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত কনটেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রেও ক্রিপ্টোর ব্যবহার বাড়ছে। সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক পেমেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই অর্থ গোপনীয়তা-নির্ভর ক্রিপ্টো মুদ্রায়, যেমন Monero-তে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। যাতে লেনদেনের উৎস গোপন থাকে।
তবে পুরো ছবিটাই অন্ধকার নয় বলেই দাবি চেনালিসিসের। সংস্থার বক্তব্য, ব্লকচেন প্রযুক্তির স্বচ্ছতা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করতে সাহায্য করছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে পাচার-সংক্রান্ত নেটওয়ার্কের আর্থিক গতিপথ বের করা সম্ভব হয়েছে। ক্রিপ্টো যেমন অপরাধের জন্য নতুন পথ খুলে দিচ্ছে, তেমনই অপরাধীদের চিহ্নিত করার রাস্তাও খুলে দিচ্ছে।