কেন দুই অভিযুক্তকে ফাঁসি, আর একই অপরাধে অভিযুক্ত মামুন পেল লঘুদণ্ড?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় বেঁচে গেলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন- তিনি মাত্র পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু কেন দুই অভিযুক্তকে ফাঁসি, আর একই অপরাধে অভিযুক্ত মামুন পেল লঘুদণ্ড? কী বলছেন নিহতদের পরিবার, কী বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা?
বিগত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান- যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ছাত্র আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিত। সেই আন্দোলনে গুলি, নির্যাতন, নিখোঁজ এবং হত্যার অভিযোগেই শুরু হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক এই বিচার। সোমবার তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করে জানায়- Sheikh Hasina and Asaduzzaman Khan Kamal were the nucleus of the crime.
আইনজীবীরা আদালতে তুলে ধরেন- ২০২৪ সালের ১৮-১৯ জুলাই এবং ৫ অগস্ট তিন দফায় ছাত্র–প্রতিবাদীদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ গিয়েছিল ‘উচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়’ থেকে।
প্রসিকিউশন দাবি করেছে- ঢাকা সাউথ সিটির মেয়র শেখ তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপের রেকর্ডেও ‘গুলি চালানোর নির্দেশ’-এর প্রমাণ মেলে। রেকর্ডে নাকি শোনা যায়- ড্রোন, হেলিকপ্টার, ব়্যাব এবং ডিজিএফআই–কে সরাসরি অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশ দেন হাসিনা।

তিনজনই একই মামলায় অভিযুক্ত হলেও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন মাত্র ৫ বছরের সাজা পেলেন। কারণ- মামুন আদালতে দায় স্বীকার করেন এবং রাজসাক্ষী হন। প্রসিকিউশন জানায়- তিনি তদন্তে সহযোগিতা করেছেন, এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আদালতকে দিয়েছেন। বিচারকদের পর্যবেক্ষণ- His cooperation saved judicial time.
কিন্তু এই রায়েই বাংলাদেশে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। নিহত ছাত্রদের পরিবার প্রশ্ন তুলছে- যে ব্যক্তি কপ্টার থেকে গুলি চালিয়েছে, সে কীভাবে মাত্র পাঁচ বছরের জেল পায়!
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী- চোখ হারানো ছোট বাসচালক খোকন চন্দ্র বর্মণ। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি জানান- নারায়ণগঞ্জে, সাইনবোর্ড এলাকায় তার চোখের সামনেই ছাত্রদের দিকে গুলি চালায় পুলিশ। তার দিকে ছুটে আসে গুলি- উপড়ে যায় একটি চোখ, থেঁতলে যায় মুখ। ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট- যাত্রাবাড়ির উড়ালপুলের নীচে ব্যারেলের পিছনে লুকিয়েছিলেন খোকন। সেখান থেকে পুলিশ টেনে বের করে মুখ লক্ষ্য করে গুলি করে। সেই গুলিই তার মুখে লাগে। অস্ত্রোপচারের পরেও দাগ মোছেনি। কণ্ঠ হয়ে গেছে ক্ষীণ।
কোর্টরুমে খোকনের বয়ান রেকর্ড দেখানো হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল প্রদর্শন করে একটি ৭ মিনিটের তথ্যচিত্র- যেখানে দেখা যায় নিহতদের পরিবার, আহতদের অসহায় ছবি, গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের শেষ মুহূর্তের ফুটেজ। সেই দৃশ্য দেখে আদালতকক্ষে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন- নিজেকে সামলাতে পারেননি রাজসাক্ষী মামুনও। অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান বলেন- “What happened last August was a heinous crime in the history of Bangladesh.” তিনি নিহতদের ন্যায়বিচারের আবেদন জানান।
হাসিনা-কামালের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী আমির হোসেন। তিনি দাবি করেন- খোকনের বয়ান ও তদন্ত রিপোর্টে ‘অনেক অসঙ্গতি’ রয়েছে। এমনকি প্রশ্ন তোলেন- “ওই দিনগুলোতে খোকন কাজে ছিলেন না, তাহলে পথে কেন নেমেছিলেন?” সরকারি আইনজীবীদের বক্তব্য- এসব প্রশ্ন সাক্ষীর বক্তব্যকে দুর্বল করার চেষ্টা, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সাক্ষ্যকে তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।
রায় ঘোষণার দিন সকালেই মামুনকে আনা হয় ট্রাইব্যুনালে। স্কাই ব্লু রঙের হাফ হাতা শার্ট, কোনো হ্যান্ডকাফ নেই। শুনানির সময় তিনি পুরোপুরি নীরব ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ও কামাল আদালতে ছিলেন না- দু’জনই পলাতক। রায় পড়া মাত্রই মামুনকে প্রিজনভ্যানে তুলে কারাগারে পাঠানো হয়। এখন থেকে তিনি থাকবেন সাধারণ বন্দি হিসেবে, তবে পাবেন ডিভিশন সুবিধা। রায় ঘোষণার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার ঝড়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে আসছে প্রশ্ন-
রাজসাক্ষী হলে কি বড় অপরাধও ক্ষমাযোগ্য?
মানুষ হত্যা করে কেউ কীভাবে পাঁচ বছরে ছাড়া পেতে পারে?
আন্দোলনে নিহত ছাত্র মীর মুগ্ধের ভাই জানিয়েছেন- তাঁরা মামুনের আজীবন কারাদণ্ড চাইতে হাইকোর্টে যাবেন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলি রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই রায় নিঃসন্দেহে বড় মোড় আনতে চলেছে। ফাঁসির সাজা কি কার্যকর হবে? পলাতক হাসিনা ও কামালকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি? রাজসাক্ষী মামুনের শাস্তি কি বাড়বে?