“ভারত মাতাকে বিক্রি করে দিলেন, লজ্জা করল না?”- লোকসভায় এমন মন্তব্য কেন করলেন রাহুল গান্ধী ?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : লোকসভার বাজেট অধিবেশনের তুমুল হইহট্টগোলের মধ্যেই ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে তুঙ্গে উঠেছিল রাজনৈতিক সংঘাত। সরকার যেখানে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ বলে প্রচার করছে, সেখানে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন— “ভারত মাতাকে বিক্রি করে দিলেন, লজ্জা করল না?”
চুক্তির মূল কাঠামো অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্য—বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ ও ইস্পাত—উপর আরোপিত প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামাতে রাজি হয়েছে। সরকারের দাবি, এতে রফতানি খাত আরও চাঙ্গা হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে এবং কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হবে। পাল্টা ভারত নাকি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল আমদানি কমানোর ইঙ্গিতও রয়েছে বলে সূত্রের খবর।
কিন্তু রাহুল গান্ধীর আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অন্যত্র ‘ডেটা সার্বভৌমত্ব’। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “এআই-এর পেট্রোল হল ডেটা। ২১ শতকের ক্ষমতার আসল উৎস আমাদের মানুষের তথ্যভান্ডার।” তাঁর দাবি, মার্কিন চাপের মুখে শুল্ক ও জ্বালানির বিনিময়ে ভারত নিজের কৌশলগত সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। মার্শাল আর্টের উপমা টেনে রাহুল গান্ধী বলেন, “এটা গ্রিপ, চোক অ্যান্ড ট্যাপ— অর্থাৎ প্রথমে ধরো, তারপর আরও চেপে ধরো, সবশেষে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করো।”
বিরোধীদের অভিযোগ, এখানে ‘রিসিপ্রোসিটি গ্যাপ’ রয়েছে। ভারতের শুল্ক প্রায় শূন্যের কোঠায় নামতে পারে, অথচ ভারতীয় রফতানিকারীদের এখনও ১৮ শতাংশের প্রাচীর টপকাতে হবে। তাদের কথায়, এটি সমঝোতা নয়, বরং আত্মসমর্পণ।
অন্যদিকে, সরকারের যুক্তি স্পষ্ট—বিশ্ব অর্থনীতির ধীর গতিতে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত বস্ত্র ও ফার্মা শিল্পে এর সুফল মিলতে পারে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, চিনের উত্থানের প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা জোরদার করবে।
তবে এর পিছনে আশঙ্কাও যথেষ্ট রয়েছে। রাশিয়ার তুলনায় মার্কিন জ্বালানি দামি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে দেশীয় বাজারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ থেকে খাদ্য—সব ক্ষেত্রেই মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, রফতানির সম্ভাব্য লাভ মুছে দিতে পারে সেই মূল্যবৃদ্ধি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ভারতের ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ নীতিকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লি একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। এই চুক্তি কি সেই নীতিতে ইতি টানছে? রাহুল গান্ধীর দাবি, “আমরা নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে হারাচ্ছি।” সরকার অবশ্য বলছে, “এটি কৌশলগত বাস্তববাদ।”
সংসদের বিতর্ক আপাতত থামার নয়। তবে চুক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আগামীদিনের পরিসংখ্যানে-রফতানির অঙ্কে, আমদানি খরচে, আর সর্বোপরি বাজারদরের ওঠানামায়। হাত মেলানোর রাজনৈতিক ছবি যতই ঝলমলে হোক না কেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে সাধারণ মানুষকেই। এই বার্তাই তুলে ধরলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।