ডিগ্রি থাকলেও কি চাকরি পাওয়া যায়?

ভারতের বেকারত্বের সংকট আজ এক গভীর কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে- বিশেষ করে শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : শুধু ডিগ্রি থাকলেই কি চাকরি নিশ্চিত? নাকি আজকের ভারতে ডিগ্রি নিজেই হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘মিথ’? বাস্তবটা কিন্তু অনেকটাই কঠিন। ভারতের বেকারত্বের সংকট আজ এক গভীর কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে- বিশেষ করে শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৩০ শতাংশ স্নাতক তরুণ-তরুণী উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি কেবল সংখ্যার হিসেব নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের দিক নির্দেশ করছে।

প্রথমেই বোঝা দরকার, সমস্যার মূল কোথায়। একদিকে প্রতি বছর লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরোচ্ছে। অন্যদিকে, সেই ডিগ্রির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চমানের চাকরি তৈরি হচ্ছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ‘মিসম্যাচ’- অর্থাৎ শিক্ষা যা দিচ্ছে, বাজার যা চাইছে, তার মধ্যে ফারাক। এই ফারাকই আজকের বেকারত্বের অন্যতম প্রধান কারণ।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম বদলাতে হবে। শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্ট ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বাড়ানো জরুরি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি একজন কমার্সের ছাত্র বাস্তবে ফিনান্সিয়াল সফটওয়্যার ব্যবহার করতে না জানেন, তাহলে শুধুমাত্র তত্ত্ব জানলেই হবে না।

এরপর আসে ভোকেশনাল ট্রেনিং বা কারিগরি শিক্ষার প্রসার। ভারতে এখনও একটি বড় অংশ মনে করে, শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই সফলতার পথ। কিন্তু বাস্তবে অনেক কাজ আছে যেখানে ডিগ্রির প্রয়োজন নেই- প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। যেমন ইলেকট্রিশিয়ান, টেকনিশিয়ান, মেশিন অপারেটর- এই সব ক্ষেত্রে দক্ষ লোকের চাহিদা প্রচুর। উন্নত দেশগুলিতে এই ধরনের প্রশিক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা আমাদের দেশেও আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, উদ্যোক্তা তৈরি করার উপর জোর দেওয়া জরুরি। আজকের যুবসমাজ যদি শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে চাকরি তৈরির কথা ভাবতে শুরু করে, তাহলে সমস্যার একটা বড় অংশ সমাধান হতে পারে। স্টার্টআপ, ছোট ব্যবসা, ডিজিটাল উদ্যোগ- এই ক্ষেত্রগুলিতে সরকারি সহায়তা ও সহজ ঋণ ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার। এতে কর্মসংস্থানও বাড়বে।

এছাড়া অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রকল্প, শিল্প স্থাপন, ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর- এই সব ক্ষেত্র সরাসরি চাকরি তৈরি করে। সরকার যদি শ্রমনির্ভর শিল্পে বেশি জোর দেয়, তাহলে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়ানো সম্ভব। নীতিগত পরিবর্তনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বা স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বিদেশ নির্ভরতা কমবে এবং দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি শ্রম আইন সহজ করা এবং ছোট ব্যবসার জন্য সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং। অনেক ছাত্রছাত্রী জানেই না, কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের সুযোগ রয়েছে। ফলে তারা এমন কোর্স বেছে নেয়, যার বাজারে চাহিদা কম। যদি স্কুল স্তর থেকেই সঠিক গাইডেন্স দেওয়া যায়, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই কমানো সম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও বড় ভূমিকা নিচ্ছে। অনেক প্রচলিত চাকরি কমে যাচ্ছে, আবার নতুন ধরনের কাজ তৈরি হচ্ছে। তাই সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট না করলে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। এই পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে, বরং নতুন দক্ষতা শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। একইসঙ্গে ‘আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট’ বা আংশিক বেকারত্বের সমস্যাও বাড়ছে। অনেক গ্র্যাজুয়েট এমন কাজ করছেন যা তাদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক কম। যেমন- ডেলিভারি, গিগ ইকোনমি ইত্যাদি। এতে আয় হলেও, দক্ষতার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর।

সবশেষে বলা যায়, ভারতের বেকারত্ব সমস্যা শুধুমাত্র চাকরির অভাব নয়, এটি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। এর সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। প্রয়োজন শিক্ষা, শিল্প, সরকার এবং সমাজ- সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। ডিগ্রি থেকে দক্ষতা, চাকরি থেকে উদ্যোগ- এই মানসিকতার পরিবর্তনই পারে ভবিষ্যতের ভারতকে নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এখন প্রশ্ন একটাই- আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?