নজরে হরিয়ানার আল ফলাহ বিশ্ববিদ্যালয়

দিল্লিতে জঙ্গি হামলা : একদল চরমপন্থী ডাক্তার কীভাবে হামলার পরিকল্পনা করল। কীভাবে টেরর মডিউলের মিটিং পয়েন্ট হয়ে উঠল আল-ফালাহ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ১৭ নম্বর বিল্ডিংয়ের এই ঘর?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক: কেঁচো খুড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল সাপ। এই প্রবাদ .বাক্য যেন জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে রইল রাজধানীর বুকে সোমবার সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণে। যে বিস্ফোরণ সাড়া ফেলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও। পরতে পরতে উঠে আসছে রোমহর্ষক তথ্য। এক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণকে নাশকতার বীজ বপনের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে ব্যবহার করছিল সন্ত্রাসবাদীরা। হরিয়ানায় আল-ফালাহ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ১৭ নম্বর বিল্ডিং। বয়েজ হস্টেল। একেবারেই সাধারণ, সাদা রং করা। স্যাঁতস্যাঁতে ঘরগুলিতে টিমটিমে আলো। এর মধ্যে রুম নম্বর ১৩ একটু বেশিই অন্যরকম। জানা যায় এই ঘরে বসেই দিল্লিতে জঙ্গি হামলার ছক কষেছিল একদল চরমপন্থী ডাক্তার। কীভাবে চলেছিল সেই পরিকল্পনা। কীভাবে টেরর মডিউলের মিটিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল এই ঘর? কি কি ঘটত এই ঘরে?

এমন অনেক প্রশ্নই উঠে আসছে হরিয়ানা-দিল্লি সীমান্ত থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল ফলাহ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। যা দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডের জেরে রাতারাতি উঠে এসেছে লাইমলাইটে। অভিযোগ সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লির লালকেল্লার কাছে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ গাড়ি বিস্ফোরণে যুক্ত তথাকথিত ‘হোয়াইট-কলার টেরর মডিউল’-এর সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই তিনজন চিকিৎসক জড়িত। উঠে এসেছে ডা. মুজাম্মিল শাকিল, ডা. শাহিন শাহিদ এবং ডা. উমর মহম্মদের নাম। একটা বিস্ফোরণের পর লাইমলাইটে চলে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। ধৌজে ৭০ একর জমিজুড়ে বিস্তৃত আল ফলাহ বিশ্ববিদ্যালয়।

আল ফলাহ বিশ্ববিদ্যালয় আল ফলাহ বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৯৭-এ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসাবে যাত্রা শুরু
পরবর্তী সময়ে জুড়ে যায় মেডিক্যালও
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত ২০১৪ সালে
২০১৫ সালে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের
তরফে সবুজ সংকেত পায় বিশ্ববিদ্যালয়
পরিচালনার দায়িত্বে আল ফলাহ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই প্রতিষ্ঠান
ট্রাস্টের সভাপতি পদে জাওয়াদ আহমেদ সিদ্দিকি
ভাইস-চেয়ারম্যান মুফতি আবদুল্লাহ কাসিমি ও সচিব মহম্মদ ওয়াজিদ
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ভূপিন্দর কৌর আনন্দ
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মহম্মদ পারভেজ
২০১৯ সালে আল ফলাহ মেডিক্যাল কলেজে স্নাতক ডিগ্রি শুরু
দু’বছর পর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও চালু হয়

বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল সায়েন্স ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি, হিউম্যানিটিজ, কম্পিউটার সায়েন্স এবং এডুকেশন নিয়ে কোর্স করানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রয়েছে তিনটি প্রধান কলেজ- আল-ফলাহ স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, ব্রাউন হিল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আল-ফলাহ স্কুল অফ এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং।

যখন দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডের সঙ্গে পরতে পরতে নাম জড়িয়ে যাচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। তখন অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগসূত্র ওড়াল আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জানানো হয়, দিল্লি বিস্ফোরণের সূত্র ধরে উঠা আসা অধ্যাপকদের সঙ্গে জঙ্গি নেটওয়ার্কের কোনও সম্পর্ক নেই।

আল-ফালাহ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ১৭ নম্বর বিল্ডিং

“আমাদের ইউনিভার্সিটি বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক এবং প্রফেশনাল কোর্স করায়
২০১৯ থেকে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এমবিবিএস পড়ুয়াদের ট্রেনিং দেওয়া শুরু
এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক এবং গ্র্যাজুয়েটরা বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত
সম্প্রতি যে সমস্ত ঘটনায় আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম জড়িয়েছে
তাতে আমরা গম্ভীর ভাবে মর্মাহত এবং উদ্বিগ্ন
নিহত নিরীহ মানুষগুলোর পরিজনের প্রতি আমাদের সমবেদনা”

দিল্লি পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে আরও বেশ কিছু তথ্য। লালকেল্লার বিস্ফোরণে অভিযুক্ত ডাক্তার মুজাম্মিল, ডাক্তার আদিল, উমর ও শাহিন কম বেশি ২০ লক্ষ টাকা জোগাড় করে। তা উমরের হাতেই তুলে দেওয়া হয়। ওই টাকা বিস্ফোরক তৈরির কাজে লাগানোর কথা ছিল। পুলওয়ামার বাসিন্দা মুজম্মিল শাকিলের কাছ থেকে যে ডায়েরি উদ্ধার হয়েছে, তা থেকে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য সামনে এসেছে। প্রতি পাতায় সন্ত্রাসের বীজমন্ত্র। ইউনিভার্সিটির বিল্ডিং নম্বর ১৭-এর ১৩ নম্বর ঘরে সব মাথা এক হয়ে এই ছক কষত। ইউনিভার্সিটির ল্যাব থেকে কেমিক্যাল কী ভাবে মুজম্মিলের রুমে এসে পৌঁছবে, সেই প্ল্যান সেখানে বসেই করেছিল তারা। এইরকম নানা তথ্য যখন উঠে এসেছে দিল্লি পুলিশের কাছে, তখন অভিযুক্তদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগসূত্র উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিবৃতি আদৌ কি ধোপে টিকবে আল-ফালাহের? এর ফলে কি বিতর্ক থামানো যাবে? যাওয়ার কথা কি? বিল্ডিং নম্বর ১৭, রুম নম্বর ১৩। সেই বিতর্ক আদৌ মুছতে দেবে তো?