উপ-মুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ?

ফ্যাশান ডিজাইনার থেকে রাজনীতির ময়দানে লড়াকু নেত্রীর ভূমিকা পালন করেছেন। উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কতটা সফল হবেন ?

নাজিয়া রহমান,নিজস্ব সংবাদদাতা : বাংলায় বিজেপির জয়জয়কার। ২০২৬ এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭ টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর এবার বাংলা পেতে চলেছে প্রথম উপ-মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপির লড়াকু নেত্রী অগ্নিমিত্রা পালের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলেই জানা যাচ্ছে। এর আগে বাংলা পুরুষ উপমুখ্যমন্ত্রী পেয়েছে। বাংলা কংগ্রেসের শাসনকালে ১ মার্চ ১৯৬৭ সালে উপ-মুখ্যমন্ত্রী হন সিপিআইএম নেতা জ্যোতি বসু। তার মেয়াদ শেষ হয় ২১ নভেম্বর ১৯৬৭ সালে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়।
এরপর অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ফের উপমুখ্যমন্ত্রী হন জ্যোতি বসু। যার মেয়াদকাল ছিল ১৬ মার্চ ১৯৭০ সাল পর্যন্ত । এরপর ১৯৭১ সালে অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনই উপমুখ্যমন্ত্রী হন কংগ্রেসের বিজয় সিং নাহার। যার মেয়াদকাল শেষ হয় ২৮ জুন ১৯৭১সালে। অন্যদিকে বাম শাসনকালে ১২ জানুয়ারী ১৯৯৯ থেকে ৫ নভেম্বর ২০০০ সাল পর্যন্ত জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন উপমুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার পালন করেন সিপিআইএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত তিনজন পুরুষ উপমুখ্যমন্ত্রী বাংলা পেয়েছে, এবার পেতে চলেছে প্রথম মহিলা উপমুখ্যমন্ত্রী। আর সেই দৌড়ে যার নাম উঠে আসছে তিনি বিজেপির অগ্নিমিত্রা পাল।

অগ্নিমিত্রা পাল। আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের জয়ী বিজেপি প্রার্থী। শনিবার ৯ মে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তিনি শপথ নিলেন। মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু অধিকারী ও তারপর মন্ত্রী পদে দিলীপ ঘোষের পর শপথ নেন অগ্নিমিত্রা। পরনে ছিল লাল পাড় সাদা শাড়ী। কপালে বড় টিপ। ফ্যাশান ডিজাইনার থেকে রাজনীতির ময়দানে। যাত্রাটা খুব একটা সহজ ছিল না অগ্নিমিত্রার। বিজেপি-র এই লড়াকু নেত্রীর জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৫ নভেম্বর । আসানসোলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা অগ্নিমিত্রা পালের। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ। পরিবারের ইচ্ছা ছিল মেয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। পরিবারের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনাও চলছিল অগ্নিমিত্রার। তাঁর ইচ্ছে ছিল একজন ভালো গাইনোকোলজিস্ট হওয়ার কিন্ত অগ্নিমিত্রা ডেন্টিস্ট পড়ার সুযোগ পান। তাই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় আসানসোল থেকেই বোটানিতে স্নাতক হন তিনি। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সেই সময়ই তিনি ভর্তি হন বিড়লা ইনস্টিটিউট অফ লিবারাল আর্টস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সে। সেখান থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে ডিপ্লোমা করার পর নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অন্যতম ফ্যাশান ডিজাইনার। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অগ্নিমিত্রা সবসময়ই বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশেষ করে কাঁথা শিল্প ও কারুকার্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এবং সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করেন। ১৯৯৭ সাল থেকে ইঙ্গা নামে নিজের একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিচালনা করছেন অগ্নিমিত্রা। একেবারে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠান পরে কলকাতার পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। ২০০৭ সালের ল্যাকমে ফ্যাশন উইকে তিনি তার কাজ প্রদর্শন করেন। এই বঙ্গ তনয়ার ডিজাইন করা পোশাক পরে শ্রীদেবী, হেমা মালিনী, মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বলিউড তারকারা র‌্যাম্পওয়াক করেন। অর্থাৎ ধীরে ধীরে ফ্যাশান ডিজাইনার হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকেন বঙ্গ তনয়া। তবে এখানেই শেষ নয় এই বঙ্গ তনয়াকে লড়াকু নেত্রীর ভুমিকায় পাশে পায় বাংলার মানুষ।
২০১৯ সালে তিনি আসেন রাজনীতিতে। তিনি যোগ দেন রাজ্য বিজেপিতে। ২০২০ সালেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি মহিলা মোর্চার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন অগ্নিমিত্রা । সভাপতি হিসেবে তিনি রাজ্যের ২৩টি জেলা জুড়ে মহিলাদের জন্য ‘‌উমা’‌ নামে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন। যা খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এরপর ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর, তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিসরে যথেষ্ট নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন অগ্নিমিত্রা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আসানসোল দক্ষিণ থেকে তিনি বিজেপির প্রার্থী হন। ওই কেন্দ্রে তাঁর বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন তৃণমূলের সায়নী ঘোষ। সায়নী ঘোষকে হারিয়ে তিনি আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক হন। এরপর ২০২২ সালে লোকসভা উপনির্বাচনে আসনসোল কেন্দ্রে অগ্নিমিত্রা পালকে বিজেপি প্রার্থী করে। ওই লোকসভা কেন্দ্রে তিনি লড়াই করলেও হেরে যান। এরপর ২০২৪ সালে ফের লোকসভা ভোটে দাঁড়ান। কিন্তু মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে তবে সেবারেও তিনি হেরে গিয়েছিলেন। হেরে গেলেও কিন্তু রাজনীতির লড়াই থেকে সরে যাননি এই বঙ্গ তনয়া। এরপর ২০২৬ সালের জানু্য়ারিতে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সহ সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। এই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে আরও একবার লড়াই-এ নামেন অগ্নিমিত্রা পাল। ফের একবার ওই কেন্দ্রে জয়লাভ করেন অগ্নিমিত্রা পাল। জয় আসে ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটে। আর এবারের জয় তাঁকে মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ যেমন করে দিয়েছে। তেমনই অগ্নিমিত্রা হাত ধরে বাংলা পেতে চলেছে প্রথম মহিলা উপমুখ্যমন্ত্রী।