সফর ছিল দু’দিনের, প্রস্তুতিও ছিল জোরকদমে, রাজ্য অতিথি হিসেবে ছত্তিশগড়ে যাওয়ার কথা ছিল দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের। কিন্তু ঠিক সফরের দিনই বদলে গেল ছবি। বুধবার এবং বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত ছত্তিশগড় সফর আচমকাই স্থগিত করে দেয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু প্রশ্ন হল-কেন শেষ মুহূর্তে এই সফর স্থগিত? সরকারি চিঠিতে কারণ হিসেবে বলা হয়েছে অপরিহার্য কারণ। কিন্তু সেই অপরিহার্য কারণটা ঠিক কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নতুন সফরের তারিখও ঘোষণা করা হয়নি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
আর এই সিদ্ধান্ত এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন SIR ইস্যুতে প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে জ্ঞানেশ কুমার। তাহলে কি দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সফর স্থগিতের কোনও যোগ রয়েছে? নাকি এর পিছনে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কোনও কারণ রয়েছে? এই মুহূর্তে উত্তর নেই। তবে প্রশ্ন কিন্তু অনেক। ৭ এবং ৮ অক্টোবর দু’দিনের সফরে ছত্তিশগড় যাওয়ার কথা ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিকের।
সফরের মধ্যে ছিল দন্তেওয়াড়া জেলার বিখ্যাত দান্তেশ্বরী মাতা মন্দির, বস্তারের চিত্রকোট জলপ্রপাত এবং কবর্ধা জেলার ভোরমদেও মন্দির পরিদর্শনের কর্মসূচি। জ্ঞানেশ কুমারের সফর ঘিরে ছত্তিশগড় প্রশাসনের তরফেও প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। তাঁকে দেওয়া হয়েছিল রাজ্য অতিথির মর্যাদা। রায়পুর প্রশাসন, পুলিশ এবং স্বামী বিবেকানন্দ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও নিরাপত্তা এবং প্রোটোকল সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছিল। অর্থাৎ সফর বাতিল হওয়ায় শুধু কমিশনের কর্মসূচিই নয়, রাজ্য প্রশাসনের প্রস্তুতিও কার্যত থেমে যায়।
ছত্তিশগড়ের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে জানানো হয়েছে, সফর স্থগিত করা হয়েছে অপরিহার্য কারণ-এ। নতুন তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ আপাতত প্রশ্নের উত্তর একটাই কেন সফর স্থগিত? কমিশনের সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কারণ অপরিহার্য। কিন্তু সেই কারণের বিস্তারিত সামনে আসেনি। জ্ঞানেশ কুমারের ছত্তিশগড় সফর এমন একটা সময়ে স্থগিত হল, যখন তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে।
বিশেষ করে ভোটার তালিকার SIR নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংঘাত এখন প্রকাশ্য। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে আন্দোলন করেছে বিরোধী দলগুলি। গত মঙ্গলবারও দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বড়সড় বিক্ষোভ হয়। রাহুল গান্ধী-সহ একাধিক বিরোধী নেতাকে পুলিশ আটক করে পরে ছেড়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে জ্ঞানেশ কুমারের ছত্তিশগড় সফর স্থগিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে জ্ঞানেশ কুমারের ছত্তিশগড় সফর স্থগিত হওয়া একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও তাঁর একাধিক নির্ধারিত সফর পিছিয়ে যাওয়ার খবর সামনে এসেছে। উত্তরপ্রদেশের মেরঠ ও বারাণসী, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের কিছু সফরও বিভিন্ন সময়ে স্থগিত হয়েছিল। আর এখন নতুন করে ছত্তিশগড়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে বারবার কেন পিছোচ্ছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সফর? এটা কি শুধুই প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়? নাকি নির্বাচন কমিশনের সামনে থাকা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের কারণে তাঁর কর্মসূচিতে পরিবর্তন আসছে? এই প্রশ্নগুলির কোনও নিশ্চিত উত্তর এখনও নির্বাচন কমিশনের তরফে দেওয়া হয়নি।
গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর স্থগিত করার দাবির মামলায় অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি। তবে নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছে নোটিস জারি করে। তারপরই মঙ্গলবার দিল্লিতে বিরোধীদের বড় আন্দোলন। আর তার পরের দিনই সামনে আসে ছত্তিশগড় সফর স্থগিতের খবর। ফলে টাইমিংটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, বুধবার দিল্লিতে একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের পর জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ দেখান ইন্ডিয়া জোটের সাংসদরা। বিক্ষোভের আগেই নির্বাচন কমিশনের সামনে পুলিশের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ভোটচুরির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে সরাসরি দেশের রাষ্ট্রপতির শরণাপন্ন হতে চলেছে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছে বিরোধী শিবির। জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে-সহ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সপা প্রধান অখিলেশ যাদবদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবনে।