খড়্গপুর সদর বিধানসভা আসনে কি আবার নিজের প্রভাব ফিরিয়ে আনতে পারবেন দিলীপ ঘোষ? ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আর দলীয় সংগঠনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে থাকবে?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : দিলীপ, নাকি শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রতিপক্ষ? ২০২৬-এর লড়াইয়ে খড়্গপুর সদর কি আবার দিলীপের ঘাঁটি প্রমাণিত হবে, নাকি বদলে যাবে সমীকরণ?
খড়্গপুর বিধানসভা আসনে এবারের লড়াইয়ে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন, তা এখন রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় এই কেন্দ্র থেকেই সাংসদ হিসেবে নিজের শক্ত ভিত তৈরি করেছিলেন তিনি। সংগঠন গড়া, কর্মীসংযোগ এবং হিন্দুত্বের ইস্যু তুলে ধরে খড়্গপুরে বিজেপির জমি শক্ত করেছিলেন দিলীপ। ফলে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনও তাঁর বড় সম্পদ।
২০২১ সালে এই কেন্দ্রে জয়লাভ করেন বিজেপির হিরন্ময় চট্টোপাধ্যায়। ৭৯ হাজার ভোট পান তিনি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দিলীপ ঘোষ ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সভাপতি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন জয় করে দলের অভাবনীয় সাফল্যের কাণ্ডারি ছিলেন। তিনি নিজে মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের মানস ভুঁইয়াকে ৮৮,৯৫২ ভোটে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন, যেখানে তিনি ৪৮.৬২% ভোট পেয়েছিলেন।
২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন আরও মজবুত হয়েছে, এবং খড়্গপুরেও তার প্রভাব স্পষ্ট। স্থানীয় স্তরে উন্নয়ন, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা এবং বুথভিত্তিক সংগঠনের জোরে তৃণমূল বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। ফলে দিলীপ ঘোষকে শুধুমাত্র নিজের ইমেজ নয়, দলীয় সংগঠনের দুর্বলতাও সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের স্পষ্টভাষী এবং আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক স্টাইল একদিকে যেমন তাঁর সমর্থকদের উজ্জীবিত করে, তেমনই বিরোধীদেরও একজোট হওয়ার সুযোগ দেয়। সংখ্যালঘু ভোট, স্থানীয় ইস্যু এবং প্রার্থী নির্বাচনের মতো বিষয়গুলো এই আসনে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে খড়গপুর সদর আসনে দিলীপ ঘোষের লড়াইটা আক্ষরিক অর্থেই এক প্রত্যাবর্তনের লড়াই। তার জন্য এই ভোট চ্যালেঞ্জফুল। আরএসএস থেকে রাজনীতিতে আসা দিলীপ ঘোষের সাংগঠনিক ক্ষমতা অত্যন্ত প্রবল। তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন এবং প্রাতঃভ্রমণ বা চায়ের আড্ডার মাধ্যমে নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখায় সিদ্ধহস্ত তিনি।
খড়গপুর সদর আসনটি তাঁর চেনা জমি। ২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকেই তিনি প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিনের কংগ্রেস দুর্গ ভেঙেছিলেন। এলাকার মানুষের কাছে তাঁর একটি গ্রহণযোগ্যতা আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৬ সালে দিলীপ ঘোষ এই আসন থেকেই জয়ী হয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চমক দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯-এ সাংসদ হওয়ার পর তিনি বিধানসভা ছাড়েন। উপ-নির্বাচনে বিজেপি এই আসনটি তৃণমূলের কাছে হেরে যায়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-দুর্গাপুর আসনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর, নিজের পুরনো দুর্গ খড়গপুরে ফিরে এসে জেতাটা তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খড়গপুর সদরে দিলীপ ঘোষের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেও, গত কয়েক বছরে দলের স্থানীয় সংগঠনে অনেক রদবদল হয়েছে। লোকসভা ভোটে পরাজয়ের পর দলের অন্দরে তার অবস্থান এবং স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে সংহতি বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তৃণমূল কংগ্রেস এই আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া। খড়গপুর সদরে সংখ্যালঘু এবং অবাঙালি ভোটারদের একটি বড় অংশ রয়েছে। তৃণমূল এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলি এই ভোটব্যাঙ্ককে সংহত করার চেষ্টা করছে। দিলীপ ঘোষের এনকাউন্টার বা বুলডোজার সংক্রান্ত বিতর্কিত মন্তব্যগুলি ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করতে পারে, যা তার জন্য তলোয়ারের দুই ধারের মতো কাজ করতে পারে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-দুর্গাপুর কেন্দ্র থেকে বড় ব্যবধানে তাঁর পরাজয় রাজনৈতিকভাবে তাঁর আত্মবিশ্বাস বা জনপ্রিয়তার ওপর একটি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। বঙ্গ বিজেপির বর্তমান নেতৃত্বের সাথে তাঁর মতবিরোধের খবর মাঝেসাঝেই প্রকাশ্যে আসে। দলের ভেতরের দলাদলি ভোটের ময়দানে তাঁর জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস খড়গপুর সদরে প্রদীপ সরকারের মতো পরিচিত মুখকে দাঁড় করিয়ে জনকল্যানমুখী প্রকল্পগুলো সামনে রেখে তাঁকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তবে নেগেটিভ দিকগুলিকে সরিয়ে রেখে কোমড় বেঁধে প্রচার ময়দানে নেমেছেন দিলীপ ঘোষ। শনিবার রোড শো করে মনোনয়ন জমা দিতে যান তিনি। এদিন দিলীপের সঙ্গে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
দিলীপ ঘোষের জন্য এই নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একদিকে যেমন তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি তাঁকে এগিয়ে রাখছে, অন্যদিকে তাঁর বিতর্কিত ভাবমূর্তি ও সাম্প্রতিক নির্বাচনী ব্যর্থতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, খড়্গপুরে দিলীপ ঘোষ এখনও প্রভাবশালী মুখ হলেও, জয় নিশ্চিত করতে হলে তাঁকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হবে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বনাম সংগঠনিক শক্তির এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, সেটাই এখন দেখার।