প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ বিজেপির অন্দরে

পোস্টার ঘিরে চাঞ্চল্য। পোস্টারে লেখা-“ধূপগুড়ির মাটি ও বিজেপি পরিবারের দীর্ঘদিনের কর্মীকেই প্রার্থী করতে হবে।”

সুপ্রিয় বসাক, নিজস্ব সংবাদদাতা : ধূপগুড়ির রাজনীতিতে হঠাৎ করেই এক নতুন বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে। শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে হাতে লেখা কিছু পোস্টার, আর সেই পোস্টার ঘিরেই এখন তুমুল চাঞ্চল্য। পোস্টারে সরাসরি লেখা-“ধূপগুড়ির মাটি ও বিজেপি পরিবারের দীর্ঘদিনের কর্মীকেই প্রার্থী করতে হবে, বাইরের বা অন্য দল থেকে আসা কাউকে মানা হবে না।” এই বার্তাই যেন আগুনে ঘি ঢেলেছে রাজনৈতিক মহলে। বুধবার সকাল থেকেই শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই পোস্টার চোখে পড়তে শুরু করে। বাজার, মোড়, রাস্তার ধারে- যেখানেই চোখ যায়, সেখানেই এই একই দাবি। খুব দ্রুতই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় স্থানীয়দের মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলোর অন্দরেও তৈরি হয় অস্বস্তি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। ভারতীয় জনতা পার্টি-র তরফে দাবি করা হয়েছে, তাদের দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই পোস্টার লাগানো হয়েছে এবং এর পেছনে রয়েছে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপির বক্তব্য, ভোটের আগে হাওয়া গরম করতে এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে তৃণমূল এই কৌশল নিয়েছে।

অন্যদিকে তৃণমূল একেবারেই ভিন্ন সুরে কথা বলছে। তাদের দাবি, বিজেপির অন্দরেই প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সেই অসন্তোষই এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে এই পোস্টারের মাধ্যমে। তৃণমূলের বক্তব্য, বিজেপি এখনও প্রার্থী ঘোষণা করতে না পারার পিছনেই রয়েছে এই গোষ্ঠীকোন্দল, আর পোস্টার তারই বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতিতে ধূপগুড়ির রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ একদিকে তৃণমূল ইতিমধ্যেই তাদের প্রার্থী হিসেবে নির্মল চন্দ্র রায়-এর নাম ঘোষণা করেছে এবং তিনি জোরকদমে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। অন্যদিকে বামফ্রন্ট প্রার্থী নিরঞ্জন রায়-ও মাঠে নেমে পড়েছেন। কিন্তু বিজেপির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে এখনও পর্যন্ত তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই বিলম্বের পেছনে অভ্যন্তরীণ মতভেদই বড় কারণ হতে পারে।

ধূপগুড়ি এমনিতেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা। এখানে প্রার্থী নির্বাচন সবসময়ই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় বনাম বহিরাগত- এই ইস্যু আগেও বহুবার ভোটে প্রভাব ফেলেছে। এবারের পোস্টার বিতর্ক সেই পুরনো ইস্যুকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। পোস্টারের ভাষা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে শুধুমাত্র প্রার্থী নির্বাচনের দাবি নয়, বরং আবেগও জড়িয়ে রয়েছে। “ভূমিপুত্র” শব্দটি ব্যবহার করে স্থানীয় পরিচয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের বার্তা সাধারণত ভোটারদের মানসিকতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পোস্টার দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একদিকে এটি হতে পারে পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল, যাতে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা যায়। অন্যদিকে এটি সত্যিই যদি দলের ভেতরের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হয়, তাহলে তা নির্বাচনের আগে বড় ধাক্কা হতে পারে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই পোস্টার কারা লাগিয়েছে? বিজেপি বলছে তৃণমূলের কাজ, তৃণমূল বলছে বিজেপির অন্দরের কাজ। কিন্তু স্পষ্ট প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। ফলে গোটা ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। এদিকে সাধারণ মানুষও এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। অনেকের মতে, প্রার্থী নির্বাচনে স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আবার কেউ কেউ বলছেন, দল যার উপর ভরসা রাখছে, তাকেই সুযোগ দেওয়া উচিত- সে স্থানীয় হোক বা বহিরাগত। সব মিলিয়ে, ধূপগুড়ির এই পোস্টার বিতর্ক এখন শুধুমাত্র একটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। ভোটের আগে এই ধরনের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই বলা কঠিন। আগামী দিনে বিজেপি কাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সেই সিদ্ধান্তই অনেকটাই নির্ধারণ করবে এই বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলবে নির্বাচনে। একদিকে প্রচার শুরু করে দিয়েছে তৃণমূল এবং সিপিএম, অন্যদিকে বিজেপি এখনও প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে চাপে। তার মধ্যেই পোস্টার রাজনীতি নতুন করে উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে ধূপগুড়ির ভোটের লড়াইকে। এখন প্রশ্ন একটাই- এই পোস্টার কি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল, নাকি সত্যিই বিজেপির অন্দরের অসন্তোষের প্রতিফলন? উত্তর মিলবে খুব শীঘ্রই, কিন্তু তার আগে পর্যন্ত ধূপগুড়ির রাজনীতি যে আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা বলাই যায়।