ডোনাল্ড ট্রাম্প বনাম মানবাধিকার!  ভবিষ্যৎ কী ?

Donald Trump vs. Human Rights : গত ১২ মাসে সবচেয়ে গভীর ক্ষত হল ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসন কৌশল। অপারেশন অরোরা অর্থাৎ যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই নাগরিকত্ব নেই এমন মানুষজনকে দ্রুত বহিষ্কার।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক:  ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার এক বছর পর মানবাধিকারে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সেসব ক্রমেই বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন আগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে, হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন হলে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির অবনতি হবে। ২০২৫-এ ইতিমধ্যে সেই ছবিটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন এবং মানবাধিকারের ধারণার মধ্যে সংঘাত কোনও ঠান্ডা যুদ্ধ নয়, বরং একটি সক্রিয় এবং বহুমুখী আক্রমণ।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্প তাঁর ইস্তেহারের নাম রেখেছিলেন অ্যাজেন্ডা ৪৭ প্ল্যাটফর্ম। অনেকেই বিষয়টিকে প্রচারের আড়ম্বরের জন্য করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। বর্তমানে সেই অ্যাজেন্ডা ৪৭-এর ফল চোখে পড়ছে। দেশে দরিদ্র, অভাবীদের নিরাপত্তা কমেছে।

গত ১২ মাসে সবচেয়ে গভীর ক্ষত হল ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসন কৌশল। অপারেশন অরোরা অর্থাৎ যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই নাগরিকত্ব নেই এমন মানুষজনকে দ্রুত বহিষ্কার। ১৭৯৮ সালের এলিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট সক্রিয় করা। যা আমেরিকার আইনি ইতিহাসকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিয়েছিল।

ট্রাম্পের এবারের শাসনকালে গণ-বহিষ্কারের বিষয়টিও ইদানিং ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গিয়েছে। গুদামঘরগুলোকে আটককেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং কর্মক্ষেত্রে অভিযানের অস্বস্তিকর বিষয়টিও উঠে এসেছে। এগুলো কেবলমাত্র আইন প্রণয়নকারী সংস্থার পদক্ষেপ নয়,  আসলে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষজনের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করার জন্যই ট্রাম্পের এই নিষ্ঠুরতা। পরিবারগুলিকে আলাদা করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলি ২০১৮ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু “প্রতিরোধ” নামক শব্দটির মাধ্যমে আবারও বিষয়টি ফিরে এসেছে। মানব সত্ত্বাকে একটি দেশীয় রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখছে সরকার। যা ক্ষতির কারণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের  “শিডিউল এফ” আদেশের কারণে ফেডারেল সিভিল সার্ভিসে শুদ্ধিকরণ অভিযান শুরু হয়েছে। ফলে হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নিয়ে তাদের জায়গায় রাজনৈতিক অনুগতদের বসিয়ে দিচ্ছে ট্রাম্পের প্রশাসন। যেগুলি মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ করে, সেই রক্ষাকবচগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলছে ট্রাম্পের প্রশাসন।  

এলজিবিটিকিউ, আমেরিকানদের জন্য, ২০২৫ সাল ছিল পরিচয়ের বিলুপ্তির বছর। প্রশাসনের পক্ষ থেকে রূপান্তরকামীদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল সহ একাধিক আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।

 ট্রাম্প ঘোষণা করেন, “আমেরিকায় কেবলমাত্র দুই লিঙ্গের মানুষের ঠাঁই হবে, নারী এবং পুরুষ। আমি ইতিমধ্যেই একটি সরকারি নীতি তৈরি করেছি। আমাদের দেশে কেবলমাত্র দু’ধরনের লিঙ্গের মানুষ থাকবেন। নারী এবং পুরুষ।“

 ফলে শুধুমাত্র বাথরুম বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা নয়, লিঙ্গ নিশ্চিতকারী চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সরকারি সাহায্য বন্ধ করেছেন ট্রাম্প। ফলে এতেই স্পষ্ট রোগী-চিকিৎসকের সম্পর্কের মধ্যেও কীভাবে নাক গলাচ্ছে প্রশাসন।  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ছেঁটে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্পের ভাবনাচিন্তাও তেমনই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

রাশিয়া এবং চিনের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে হাঁটার হুঁশিয়ারি। ইউক্রেন এবং তাইওয়ানের জনগণকে তাদের আগ্রাসী প্রতিবেশীদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়াটাও প্রমাণ করছে যে, ট্রাম্প যে শান্তির দাবি করেন, তা হল কবরস্থানের শান্তি। সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার বিনিময়ে কেনা স্থিতিশীলতা।

ট্রাম্পের এই মেয়াদের বাকি তিন বছরে কয়েকটা প্রশ্ন ভীষণভাবে উঠে আসছে যে, প্রশাসন কি তার গতিপথ পরিবর্তন করবে? আদালত, গণমাধ্যম এবং আমেরিকান জনগণের এই আক্রমণ প্রতিহত করার মতো সহনশীলতা কি আছে ? তার উত্তর দেবে সময়।