প্রধান বিচারপতির অত ‘সময় নেই’ !

আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর পুলিশি দমনপীড়ন নিয়ে জরুরি শুনানির আবেদন খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি-র আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়ন নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এই মুহূর্তে আদালত এ বিষয়ে কোনও হস্তক্ষেপ করবে না। এমনকী পুলিশের বিরুদ্ধে পেশ করা নির্যাতনের ভিডিও দেখার অনুরোধও সরাসরি নাকচ করে তিনি বলেন, আমাদের ভিডিও দেখার সময় নেই। গত সোমবার সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনে চলো সংসদ অভিযানের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি। সেখানে পুলিশি তাণ্ডবের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টকে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা গ্রহণ ও জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু বুধবার স্পষ্ট ভাষায় সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। আদালত কক্ষে প্রধান বিচারপতি সরাসরি জানিয়ে দেন, ভিডিও জমা দিয়ে শীর্ষ আদালতের মূল্যবান সময় যেন নষ্ট করা না হয়।

বুধবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহানার সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চের সামনে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। আবেদনকারী শীর্ষ আদালতের কাছে আর্জি জানান, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি-র আমূল সংস্কারের দাবিতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী যখন সংসদের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন দিল্লি পুলিশ তাঁদের ওপর মারাত্মক হামলা চালায়। তাই শীর্ষ আদালতের উচিত এই বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করা।

তবে মামলাকারীর এই আর্জি শোনামাত্রই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কড়া সুর চড়িয়ে বলেন, আমাদের সময় নষ্ট করবেন না, আর নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না। আইনি যে পথ ও নিয়ম রয়েছে, তা অনুসরণ করুন। তবুও পিছু না হটে আবেদনকারী আইনজীবী আদালতকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। নিট পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এনটিএ-র গাফিলতি জড়িয়ে রয়েছে এই পিছনে। এমনকী পুলিশ যে সম্পূর্ণ নিরাপরাধ ও নিরস্ত্র পড়ুয়াদের ওপর নৃশংসভাবে লাঠিচার্জ করেছে, তার প্রামাণ্য ভিডিও ফুটেজ আদালতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি। কিন্তু বেঞ্চ সেই প্রস্তাব এক কথায় নাকচ করে দেয়। পুলিশি অত্যাচারের ভিডিও দেখতে বা জমা নিতে সোজাসুজি অস্বীকার করে বেঞ্চ মন্তব্য করে, আমরা কোনও ভিডিও দেখতে আগ্রহী নই। ভিডিও দেখার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। এরপরই তিন বিচারপতির বেঞ্চ সংক্ষেপে ধন্যবাদ জানিয়ে জরুরি শুনানির আর্জি বাতিল করে দেয়।

অন্যদিকে, সিজেপি সংসদ অভিযানে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চাইল দিল্লি হাইকোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশকে এ বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাতে হবে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট সমস্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, ভিডিওগ্রাফি এবং অন্যান্য রেকর্ড সংরক্ষণের নির্দেশও পুলিশকে দিয়েছে আদালত। দিল্লি হাই কোর্টে এ বিষয়ে দু’টি জনস্বার্থ মামলা হয়। তার ভিত্তিতেই পুলিশ এবং কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে দিল্লি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিকে উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার বেঞ্চ। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ফের এই মামলার শুনানি হবে। তার আগে হলফনামা দিয়ে বক্তব্য জানাতে হবে পুলিশ এবং কেন্দ্রকে।
কী ঘটেছিল ২০ জুলাইয়ের চলো সংসদ অভিযানে?

জাতীয় রাজধানী দিল্লিতে যন্তর মন্তরে একটানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অনশন ও ধর্না অবস্থান চালিয়ে আসছিল সিজেপি। এরপর গত সোমবার, অর্থাৎ ২০ জুলাই সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর দিনে চলো সংসদ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পড়ুয়া যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দিকে মিছিল করে এগোতে থাকেন। তাঁদের দাবি ছিল একটাই, একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, একের পর এক পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার এবং এনটিএ-র সংস্কার।

মিছিলটি সেন্ট্রাল দিল্লির দিকে এগোতেই দিল্লি পুলিশ ব্যারিকেড গড়ে তা আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিকেলের দিকে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের একটি বড় দল পুলিশের সেই বহুমুখী ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের ভবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর পরপরই উন্মুক্ত রাস্তায় তৈরি হয় রণক্ষেত্র। ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তারক্ষীরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশকর্মীরা একের পর এক হেলমেট ও ঢালবিহীন নিরস্ত্র পড়ুয়াকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় অনেক আন্দোলনকারীকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়। যদিও দিল্লি পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীরাই প্রথম হিংসাত্মক রূপ নেয় এবং নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থেই পুলিশ মৃদু বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল।

হাসপাতাল সূত্রের খবর, পুলিশের এই বলপ্রয়োগের ঘটনার পর প্রায় ১০০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী জখম অবস্থায় চিকিৎসা করাতে আসেন। তবে দিল্লি পুলিশের মতে আহত পড়ুয়ার সংখ্যা ৬০ জনের কাছাকাছি।

সুপ্রিম কোর্ট জরুরি ভিত্তিতে আবেদন শুনতে রাজি না হওয়ায় এখন পুরো বিষয়টি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোবে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদ থেকে রাজপথ – কেন্দ্রের মোদী সরকারের ওপর যে রাজনৈতিক চাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।