টি-২০ বিশ্বকাপের আগে নাটকীয় পরিস্থিতি!

শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা কার পাশে দাঁড়াবে, নাকি নিরপেক্ষতার পথই বেছে নেবে?

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ক্রিকেটের ইতিহাসে বহুবারই দেখা গিয়েছে, মাঠের বাইরের রাজনীতি এসে ছায়া ফেলেছে মাঠের লড়াইয়ের উপর। আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপকে ঘিরে সেই চেনা ছবিটাই আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব যে ক্রিকেটে পড়বে তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার সেই জটিল সমীকরণে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নামও। ফলে বিশ্বকাপ আয়োজনকে কেন্দ্র করে গোটা উপমহাদেশের ক্রিকেট যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে এক অস্বস্তিকর রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে। এই তিন দেশের টানাপোড়েনের মাঝখানে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা। যাদের অবস্থান এখন সবচেয়ে সংবেদনশীল। প্রশ্ন উঠছে, শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা কার পাশে দাঁড়াবে, নাকি নিরপেক্ষতার পথই বেছে নেবে?

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য সম্পর্ক যে বহু বছর ধরেই তলানিতে তা কারও অজানা নয়। সেই কারণেই দুই দেশ একে অপরের মাটিতে গিয়ে খেলে না। এই সিদ্ধান্ত আগেই কার্যত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। তারই ফলশ্রুতিতে এবারের টি-২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের কোনও ম্যাচ ভারতে রাখা হয়নি। পরিবর্তে পাকিস্তানের সব ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। এই সিদ্বান্ত একদিকে যেমন পাকিস্তানের জন্য স্বস্তির তেমনই শ্রীলঙ্কার জন্য আর্থিক ও ক্রীড়াগত দিক থেকে বড়সড় লাভের সুযোগ এনে দিয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক ম্যাচ মানেই স্পনসরশিপ, সম্প্রচার ও দর্শক টানার সম্ভাবনা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতে খেলতে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ। বিসিবির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে গিয়ে খেলতে তাদের আপত্তি আছে। বাংলাদেশের এই দাবি নতুন নয়। অতীতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেখানে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে নিরপেক্ষ ভেন্যুর প্রয়োজন পড়েছে। এশিয়া কাপের সময় ভারতও একাধিকবার শ্রীলঙ্কাকে নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফলে বারবারই দেখা গিয়েছে, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সংঘাতের ফাঁকে ফাঁকে লাভের গুড় কুড়িয়েছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড। এই কারণেই শ্রীলঙ্কার অবস্থান সবসময়ই অত্যন্ত সতর্ক ও হিসেবি। তারা জানে, একবার কোনও পক্ষ নিলে ভবিষ্যতে তার প্রভাব পড়তে পারে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও ক্রিকেটীয় সূচিতে। তাই এতদিন ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের এই টানাপোড়েন নিয়ে প্রকাশ্যে নীরবই ছিল শ্রীলঙ্কা। তবে বিশ্বকাপ ঘিরে নাটক যখন চরমে তখন অবশেষে মুখ খুলেছেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের সচিব বান্দুলা দিশানায়েক। তাঁর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে দিয়েছেন লঙ্কা বোর্ডের অবস্থান। তাঁর কথায়, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের এই লড়াইয়ে আমরা নিরপেক্ষ ছিলাম, এখনও আছি। তিন দেশই আমাদের বন্ধু দেশ। তিনি আরও জানান, কোনও আঞ্চলিক বা রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছা নেই কলম্বোর। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা জানে যে তিন দেশের মধ্যেই মতবিরোধ চলছে, কিন্তু সেই বিরোধে পক্ষ নেওয়া তাদের নীতির পরিপন্থী।

বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কার এই নিরপেক্ষতার পেছনে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যেই নয়, রয়েছে বাস্তব হিসেবও। ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ড, পাকিস্তান ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট শক্তি, আর বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতিশীল এক দল। এই তিন দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূরর্ণ। তাই কারও বিরাগভাজন না হয়ে, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখাই এখন তাদের প্রধান কৌশল। সব মিলিয়ে বলা যায়, টি-২০ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ক্রিকেট যেন এক কূটনৈতিক নাট্যমঞ্চে পরিণত হয়েছে। মাঠে বল গড়ানোর আগেই চলছে ভেন্যু বদলের হিসেব, রাজনৈতিক বার্তা আর বোর্ড-স্তরের কৌশলগত সিদ্ধান্ত। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের এই টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে শ্রীলঙ্কা একদিকে যেমন চাপে, তেমনই সুযোগও কাজে লাগাচ্ছে। এই কূটনৈতিক জটিলতার প্রভাব মাঠের খেলায় কতটা পড়ে, আর শ্রীলঙ্কা কতটা সফলভাবে নিরপেক্ষতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, সেটাই এখন বিশ্বক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, টি-২০ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ক্রিকেট যেন শুধুই একটি খেলায় সীমাবদ্ধ না থেকে উপমহাদেশের কূটনীতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও পারস্পরিক স্বার্থের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ এবং সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলির জেরে যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শ্রীলঙ্কা আপাতভাবে নিরপেক্ষতার অবস্থান নিয়েই এগোতে চাইছে। প্রকাশ্যে সবাই বন্ধু বার্তা দিলেও, বাস্তবে লঙ্কা বোর্ডের সামনে রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ। কারণ তিন দেশই তাদের কাছে ক্রিকেটীয় ও কূটনৈতিক দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ, আর্থিক লাভ ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়ানোর সম্ভাবনা, অন্যদিকে আবার কোনও একটি পক্ষের অসন্তোষ ডেকে আনার আশঙ্কা এই দুইয়ের মাঝেই চলতে হচ্ছে কলম্বোকে। ভেন্যু বদল, ম্যাচ সূচি পুনর্বিন্যাস কিংবা নিরপেক্ষ মাঠের তর্ক আসলে বৃহত্তর ক্রিকেট রাজনীতিরই প্রতিফলন, যেখানে মাঠের বাইরের সিদ্ধান্ত অনেক সময় মাঠের লড়াইয়ের থেকেও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। টি-২০ বিশ্বকাপের আগে যে নাটকীয় পরিস্থিতি দিনে দিনে তৈরি হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, উপমহাদেশের ক্রিকেটে কূটনীতি আর খেলা আজ আর আলাদা কোনও সীমানায় আবদ্ধ নেই।