দীর্ঘ লড়াইয়েরই পুরস্কার পেলেন দুধকুমার

ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে জিতেই তিনি সটান পৌঁছে গেলেন মন্ত্রীর চেয়ারে দুধকুমার মণ্ডল।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জয়ের চেয়ে পরাজয়ের মুখই বেশি দেখেছেন তিনি। একের পর এক নির্বাচনে হেরেও ভেঙে পড়েননি, ছাড়েননি সংগঠনের কাজ। বরং মাটির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করেই এগিয়ে গিয়েছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। অবশেষে সেই ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি মিলল ২০২৬ সালে।

২০১১ সালে প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। ২০১৬ সালে রামপুরহাট কেন্দ্র থেকে লড়েও পরাজিত হন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে বীরভূম লোকসভা কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, সেখানেও সাফল্য অধরা থাকে। কিন্তু বারবার পরাজয়ের পরেও তিনি রাজনীতির ময়দান ছাড়েননি। সংগঠনের কাজ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন নিরলসভাবে। ২০১৫ সালে বিজেপির বীরভূম জেলা সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলার সংগঠন বিস্তারে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। সেই দীর্ঘ লড়াইয়েরই পুরস্কার মিলেছে ২০২৬ সালে।

মাছ, মাংস, বিরিয়ানি কিংবা মোগলাই খাবারের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ নেই তাঁর। বরং সাধারণ দুধভাতই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় খাবার। রাজনৈতিক জীবনে যেমন ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং মাটির মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি রয়ে গিয়েছেন অত্যন্ত সহজ-সরল এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একজন মানুষ। তাঁর পছন্দের খাবারের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে যেন তাঁরই নাম। তিনি হলেন দুধকুমার মণ্ডল।

দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজ তিনি বিধায়ক। পূর্ণ মন্ত্রী হলেন । আর সেই যাত্রাপথে দুধকুমার মণ্ডল শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হিসেবেই নন, নিজের স্বতন্ত্র জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের কারণেও বীরভূমের রাজনৈতিক পরিসরে এক পরিচিত এবং ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে উঠেছেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেন দুধকুমার মণ্ডল। ১৯৮৮ সালে ময়ূরেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই জয়ী হন। এরপর গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য, প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ স্তরে দীর্ঘদিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। স্থানীয় স্তরের রাজনীতির অভিজ্ঞতা তাঁকে ধীরে ধীরে জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজেপি নেতায় পরিণত করে।

আটের দশক থেকে গেরুয়া রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নানা উত্থান-পতন, ঝড়ঝঞ্ঝা সামলেছেন। ব্যক্তিগত সাফল্য, ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে দলের প্রতি থেকেছেন একনিষ্ঠ। অবশেষে ২০২৬ সাল তাঁকে স্বপ্নপূরণের দুয়ারে দাঁড় করাল। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে জিতেই তিনি সটান পৌঁছে গেলেন মন্ত্রীর চেয়ারে। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, একাধিক নির্বাচনী পরাজয় এবং সাংগঠনিক পরিশ্রমের পর অবশেষে এই নির্বাচনে বড়সড় জয়ের স্বাদ পেলেন তিনি। ময়ূরেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে এবার প্রথমবার বিধানসভায় পা রেখে বসলেন মন্ত্রীর আসনে। প্রথমবার বিধানসভায় গিয়েই এবার দুধকুমারের সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হল মন্ত্রিত্বের পালক। সোমবার লোকভবনে শপথগ্রহণের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।

দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক লড়াই, একের পর এক নির্বাচনী পরাজয়, আর মাটির মানুষের সঙ্গে অটুট সম্পর্ক। সব মিলিয়ে দুধকুমার মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবনের গল্প যেন অধ্যবসায়েরই আরেক নাম। ময়ূরেশ্বরের গ্রামবাংলা থেকে লোকভবনের মন্ত্রিসভা। এই পথচলা শুধু একজন নেতার সাফল্যের কাহনি নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষা, নিষ্ঠা এবং সংগ্রামের এক বাস্তব উদাহরণ। বীরভূমের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবার প্রশাসনিক দায়িত্বেও নিজেকে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ দুধকুমার মণ্ডলের সামনে।