অনিল আম্বানির বাড়িতে হাত ইডির !

এই অ্যাটাচমেন্টের অর্থ কী? কোন মামলার প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ? কী অভিযোগ উঠেছে? সামনে কী হতে পারে?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : দেশের অন্যতম বহুল আলোচিত কর্পোরেট তদন্তে বড় পদক্ষেপ। রিলায়েন্স গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান অনিল আম্বানি-র মুম্বইয়ের বিলাসবহুল ১৭ তলা আবাস ‘Abode’ অ্যাটাচ করল Enforcement Directorate বা ইডি। ৩ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা মূল্যমানের এই সম্পত্তি সংযুক্ত করা হয়েছে মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তে। এই পদক্ষেপের পর মামলায় মোট সংযুক্ত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াল প্রায় ১৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

অ্যাটাচমেন্ট মানে কী?

প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার- অ্যাটাচমেন্ট মানে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা নয়। Enforcement Directorate যখন Prevention of Money Laundering Act-এর আওতায় প্রোভিশনাল অ্যাটাচমেন্ট অর্ডার জারি করে, তখন তার অর্থ- তদন্ত চলাকালীন সেই সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর বা মালিকানা বদল করা যাবে না। অর্থাৎ, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি সুরক্ষিত থাকবে।

‘Abode’- বিলাসের প্রতীক

অ্যাটাচ হওয়া সম্পত্তির নাম ‘Abode’। মুম্বইয়ের অভিজাত পালি হিল এলাকায় অবস্থিত এই বাড়িটি- ৬৬ মিটার উচ্চতা, ১৭ তলা উচ্চতা, ছাদে হেলিপ্যাড, বহুতল বিলাসবহুল আবাসন। সূত্র বলছে, এর একটি অংশ- প্রায় ৪৭৩ কোটি টাকার সম্পত্তি আগেই অ্যাটাচ করা হয়েছিল।

কোন মামলায় এই পদক্ষেপ?

এই তদন্ত মূলত Reliance Communications বা আরকম-কে ঘিরে। অভিযোগ- ব্যাঙ্ক ঋণ জালিয়াতি, ঋণ তছরুপ এবং অর্থ পাচার। আরকম ও তার গ্রুপ সংস্থাগুলি দেশি-বিদেশি ঋণদাতাদের কাছ থেকে মোট প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল। বর্তমানে সংস্থাটি দেউলিয়া প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ

তদন্তে বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া। আদালতের নির্দেশে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। এরপরই তদন্তে গতি বাড়ে। অনিল আম্বানি ইতিমধ্যেই একবার হাজিরা দিয়েছেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদ নির্ধারিত ছিল। তিনি আদালতকে জানিয়েছেন- অনুমতি ছাড়া তিনি বিদেশ যাবেন না।

ইয়েস ব্যাঙ্ক ঋণ বিতর্ক

প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ Yes Bank থেকে নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ—

শেল কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ ঘোরানো
অনুমোদনের আগেই ঋণ বিতরণ
ব্যাকডেটেড ক্রেডিট মেমোরেন্ডাম
যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ অনুমোদন

এমনকি ঋণ বিতরণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রোমোটার-সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানে অর্থ লেনদেন হয়েছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রিলায়েন্স হোম ফিন্যান্সের ভূমিকা

তদন্তের আওতায় এসেছে Reliance Home Finance Limited। সেবি-র তথ্য অনুযায়ী- ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে কর্পোরেট ঋণ ছিল প্রায় ৩,৭৪২ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮,৬৭০ কোটির বেশি। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে বৃহত্তর ঋণ তছরুপের যোগ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিবিআই এবং অন্যান্য সংস্থার ভূমিকা

এই মামলায় ইতিমধ্যেই দুটি এফআইআর দায়ের করেছে Central Bureau of Investigation। অভিযোগ- প্রতারণা, ঘুষ, জনসাধারণের তহবিল সরানো। এছাড়া ইনপুট দিয়েছে- ন্যাশনাল হাউজিং ব্যাঙ্ক, সেবি, ন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অথরিটি, ব্যাঙ্ক অফ বরোদা।

SBI-এর ‘ফ্রড’ ট্যাগ

State Bank of India আরকম ও অনিল আম্বানিকে আরবিআই গাইডলাইন অনুযায়ী ‘ফ্রড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসবিআইয়ের এক্সপোজার- ২,২২৭ কোটি টাকা ফান্ড-ভিত্তিক ঋণ, ৭৮৬ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি। ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে Insolvency and Bankruptcy Code-এর অধীনে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

২০২০ সালে ব্রিটেনের আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছিলেন অনিল আম্বানি। একটি চিনা ব্যাঙ্কের ৫,০০০ কোটি টাকার ঋণ না মেটানো নিয়ে মামলা হয়েছিল। সেই সময় তিনি জানান- তাঁর কোনও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেই।

পারিবারিক ও কর্পোরেট মাত্রা

অনিলের স্ত্রী টিনা আম্বানিকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল। নিউ ইয়র্কে বিলাসবহুল বাড়ি কেনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে তাঁর দুই পুত্র- জয় আনমোল ও জয় আনশুল- সম্প্রতি ভুটানে সৌর প্রকল্পে বরাত পাওয়ার মাধ্যমে সংস্থার পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। জার্মান সংস্থা Rheinmetall AG-র সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে বলে জানা যায়।

গ্রুপ কোম্পানির প্রতিক্রিয়া

Reliance Power এবং Reliance Infrastructure স্পষ্ট জানিয়েছে- তাদের আরকম বা রিলায়েন্স হোম ফিন্যান্সের সঙ্গে কোনও আর্থিক যোগ নেই। অনিল আম্বানি এই সংস্থাগুলির বোর্ডেও নেই।

তদন্ত যত এগোবে- আর্থিক লেনদেনের স্তরগুলি আরও স্পষ্ট হবে, আদালতের শুনানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সংযুক্ত সম্পত্তি চূড়ান্ত বাজেয়াপ্ত হবে কিনা, তা নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়ার উপর। ‘Abode’ সংযুক্তির মাধ্যমে ভারতের অন্যতম আলোচিত কর্পোরেট তদন্তে নতুন অধ্যায় শুরু হল। ৩,৭১৬ কোটির বিলাসবহুল বাড়ি এখন আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে। মোট সংযুক্ত সম্পদের অঙ্ক ১৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এই তদন্ত শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে নয়- এটি বৃহত্তর আর্থিক শৃঙ্খলা, কর্পোরেট দায়বদ্ধতা এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপই নির্ধারণ করবে এই মামলা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।