২০২৬-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন নাকি খেলা বদলে দেবে বিজেপি ?

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : WHAT BENAL THINGS TODAY..INDIA THINKS TOMOROW অর্থাৎ “বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল ভাববে” বিখ্যাত এই উক্তিটি সমাজ সংস্কারক ও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগণ্য নেতাদের মধ্যে অন্যতম শ্রী গোপাল কৃষ্ণ গোখলের।যা বাংলার অগ্রগামী চিন্তা, শিক্ষা এবং রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই সূত্র ধরে ২০২৬-এর নির্বাচন নিয়ে কি ভাবছে বাংলা? কি চলছে বাংলার মানুষের মনে?
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে আপনাকে আগে বুঝতে হবে এ রাজ্যের পরিকাঠামোকে। চাষবাষের প্রেক্ষিতে দেশে চতুর্থ স্থানে রয়েছে এই রাজ্য। এটির পূর্বে বাংলাদেশ, উত্তরে সিকিম ও ভুটান, উত্তর-পশ্চিমে নেপাল এবং পশ্চিমে বিহার ও ঝাড়খণ্ড এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ওড়িশা দ্বারা পরিবেষ্টিত। পশ্চিম বাংলার মানচিত্রে উত্তরে রয়েছে দার্জিলিং,যেখানে চায়ের বাগানের মাঝখান দিয়ে ছোট্ট ট্রেন যেতে দেখা যায়।দার্জিলিংয়ে হিমালয় পর্বতমালার সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে।দার্জিলিং অধিকাংশ বাসিন্দা গোর্খা বা নেপালি। এবার পাহাড়কে পিছনে ফেলে যত নিচের দিকে এগোলে আসে শিলিগুড়ি। এটাই দেশের চিকেন নেক।
এগোতে এগোতে পৌঁছে যাওয়া যায় নবাবের দরবার মুর্শিদাবাদে। যেখানে মাথাউঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজারদুয়ারি রাজপ্রাাসাদ। এটা শুধু একটা অট্টালিকা নয় ,বাংলায় নবাবী রাজত্ব ও বিট্রিশদের আগমনের ঐতিহাসিক সাক্ষ বহন করছে এই রাজপ্রাসাদ।এবার আরও একটু এগোলে সাক্ষাৎ হয় রাজ্যের রাজধানী কলকাতার সঙ্গে।দেশের মেট্রোপলিটন সিটিগুলির অন্যতম এই শহর।যেখানে আছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল,হাওড়া ব্রিজ,দক্ষিনেশ্বর কালি মন্দির । একটু এগোলেই সাক্ষাৎ হবে বীরভূমের নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজরিত শান্তিনিকেতনের সঙ্গে।যেখানে শিক্ষা ও সংস্কৃতি একসাথে শ্বাস নেয়।
রাজ্যের দক্ষিণে পা রাখলেই ডাঙা থেকে ক্রমশ জলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পালা। যেখানে রয়েছে সুন্দরবন। বিশ্বের সবথেকে বড় ম্যানগ্রোভ অরন্য রয়েছে এখানে।এই সুন্দর অরন্য ও জলে নামার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।এখানে সুন্দরী গাছের আড়ালে শিকার ধরার জন্য ওত পেতে বসে থাকতে পারে রয়েল বেঙ্গল টাইগার।জলে রয়েছে কুমীর। এখানকারর মধু বিশ্ববিখ্যাত।
এই বৈচিত্রময় রাজ্যই হল বাংলা বা পশ্চিমবাংলা।২০২৬ এ দু দফার ভোট। প্রথম দফার ভোট দার্জিলিং,মালদা,মুর্শিদাবাদ-সহ ১৬ জেলার ১৫২টি কেন্দ্রে। ১৪২ আসনে দ্বিতীয় দফার ভোট দান ২৯শে এপ্রিল। আগামী চৌঠা মেয়ে ফলপ্রকাশের দিন ২৯৪ আসনে কোন বিধায়করা বসতে চলেছেন? এটা জানতে হলে বুঝতে হবে ২০২১-এর নির্বাচনের খেলা। গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ঘাসফুল শিবিরের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল রাজনৈতিক মহলের।যেখানে ২৯৪ আসনের মধ্যে ২১৩টি আসনে জয়লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস।সে বছর টানা তৃতীয় বারের মত মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহন করেছিলেন মমতা। ভারতীয় জনতা পার্টি ৭৭টি সিট জিতে প্রথমবার বিরোধী দল হিসাবে রাজ্যে আত্মপ্রকাশ করে।বাকিদের খাতায় ছিল ২ টি সিট। প্রথমবার রাজ্যে কংগ্রেস ও বামের খাতাই খুলতে পারেনি।
এবার কথা বলব ভোট শতাংশের। টিএমসি পেয়েছিল ৪৮ শতাংশ ভোট। যা ওই সময় সবথেকে বেশি ছিল। বিজেপি পেয়েছিল ৩৮ শতাংস ও লেফ্ট ফ্রন্ট পেয়েছিল ১০ শতাংশ। সবথেকে বড় বিষয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল বড় জয় পেলেও , মমতা নিজে হেরে গেলেন নন্দীগ্রামে। একদা তাঁরই দলের সৈনিক তথা বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরেছিলেন মমতা।
২০২১ ভোটদান হয়েছিল ৮২ শতাংশ। ফলাফল বাহ্যিকভাবে একতরফা হলেও,নির্বাচনী লড়াইয়ের দিক থেকে ছিল হাই ইনস্টেসিটি। এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন,এইবার বাংলার মনস্তত্ত্ব কি বলছে। কি খেলা চলছে। সেই বিষয়ে নজর রাখব।প্রথমেই আসা যাক উত্তরবঙ্গের প্রসঙ্গে। এখানে মোট ৫৪টি বিধানসভা আসন রয়েছে। এখানে প্রথম দফাতেই ভোট হয়েছে।এখানে বিজেপি নিজের মাটি শক্ত করে ধরে রেখেছে। ২০২১-এ বিজেপি ৫৪টির মধ্যে ২৯টি আসনে জয়লাভ করেছিল। সেখানে তৃণমূলের ঝুলিতে ছিল ২৪টি আসন। গতবারের এই অল্পের জন্য পিছিয়ে পড়ার বিষয়টিকে ঠিক করার আগ্রহ সেইভাবে জেলা তৃণমূলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ধরা পড়েনি।২০২৬-এ সালের পাহাড়ে গোর্খা ইস্যু আবারও প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক প্রচারে ক্ষমতায় এলে আগামী ৬ মাসে পাহাড়ের গোর্খা সম্প্রদায়ের সমস্যার সমাধান এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বড় আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এবার আসা যাক সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বেল্ট বা এলাকাগুলোর কথায়।যেখানে মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার মত এলাকা পড়ে। যেখানে ৩৯টির মতো আসন রয়েছে। ২০২১ সালে এখানে ২৮টি সিট জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস।যেখানে বিজেপির দখলে ছিল ১১টি আসন।এই এলাকাগুলিকে তৃণমূলের গড় বলা হয়।কারন এখানের সংখ্য়লঘুর আধিক্য। এসআইআর এই বছর এখানের বড় ইস্যু।পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে কলকাতা মেট্রো ও শহরতলি এলাকা। এখানে ৮০টির মত বিধানসভা আসন। যার মধ্যে পড়ে কলকাতা,উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা ও হাওড়ার মত বড় জেলা।এই এলাকাগুলির মেজাজ বাংলার রাজনীতির দিক নির্নয় করে। নন্দীগ্রামও এই এলাকাগুলির মধ্যেই পড়ে। যেখানে গত নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়েছিল।
সবশেষে আসা যাক বঙ্গের পশ্চিম ও দক্ষিণ এলাকা। মানে শিল্প ও শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা।রাজ্যের রাজনীতির আরও একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। এখানে ৯০ থেকে ১০০টির মত বিধানসভা আসন আছে। হুগলি,পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর,পূর্ব বর্ধমানের মত এলাকা যার অর্ন্তভুক্ত। এখানে একদিতে বড় শিল্প শহর রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চল। দুর্গাপুর,আসানসোলের মত জেলা শিল্পাঞ্চলের বড় কেন্দ্র। বিশেষত কয়লা ও স্টিল সেক্টর। ২০০৬ এই এলাকাগুলিই জমি আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল। সিঙ্গরে টাটা ন্যানো প্রজেক্টের বিরোধিতা,রাজনীতিতে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছিল। যা পুরো বাংলার রাজনীতির বদল ঘটিয়েছিল।
এখন দেখার ২০২৬-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হন নাকি বিজেপি পুরো খেলা বদলে দেয়। ৪ঠা মেয়ের ফলাফলেই স্পষ্ট হবে সরকার গঠনে কার পক্ষে রায় দেয় বাংলার জনগণ।