বাংলাদেশে তেল বিক্রির উপর সীমা বাঁধা হল। বাইক প্রতি সর্বোচ্চ ২ লিটার তেল, ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে গোটা বিশ্বেই জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা, সরবরাহে অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে বিপাকে পড়েছে একাধিক দেশ। সেই পরিস্থিতিতে এবার ভারতের কাছে সাহায্যের হাত পাতল বাংলাদেশ। ভারতের আসামের নুমালিগড় তেল শোধনাগার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে পাঁচ হাজার টন ডিজেল। এই সরবরাহ শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তির অংশ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি কূটনীতির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কেন এই ডিজেল সরবরাহ এত গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে চলছে এই পাইপলাইন প্রকল্প, এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে তেলের প্রধান পরিবহন পথগুলিতে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হলো হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বহু তেলের ট্যাঙ্কার আটকে রয়েছে সেখানে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, শত শত তেলের জাহাজ বর্তমানে হরমুজ প্রণালী এলাকায় আটকে রয়েছে। এর মধ্যে ভারতেরও ৩০টির বেশি জাহাজ রয়েছে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি
এই বৈশ্বিক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ডিজেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশটির মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেলের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে দৈনিক ডিজেলের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় হঠাৎ করেই ডিজেলের চাহিদা বেড়ে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছে যায়। এর ফলে দ্রুত জ্বালানি সংকট দেখা দেয় দেশজুড়ে। অনেক জায়গায় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। যেখানে পাম্প খোলা রয়েছে, সেখানে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। বাইক বা গাড়ির চালকদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তেল পাওয়ার জন্য।

তেল বিক্রিতে সীমা
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশটিতে তেল বিক্রির উপর সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী- বাইক প্রতি সর্বোচ্চ ২ লিটার তেল, ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া ঠেকানো। এছাড়াও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বেশ কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আগাম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি ঈদের ছুটিও আগাম ঘোষণা করা হয়েছে শক্তি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে।
গ্যাস সংকট ও কালোবাজারি
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট নতুন নয়। এর আগেও দেশটিতে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারে কালোবাজারির অভিযোগ ওঠে। সিলিন্ডারের দাম অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে তেল সংকট তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ভারতের সাহায্য
এই কঠিন পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে পাঁচ হাজার টন ডিজেল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সংস্থার চেয়ারম্যান মহম্মদ রেজানুর রহমান জানিয়েছেন- ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বার্ষিক চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ভারত থেকে বাংলাদেশে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে যে পাঁচ হাজার টন ডিজেল পাঠানো হচ্ছে, তা এই বার্ষিক চুক্তিরই একটি অংশ।
পাইপলাইন প্রকল্প
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের জন্য যে পাইপলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে সেটির নাম বাংলাদেশ- ভারত মৈত্রী পাইপলাইন। এই পাইপলাইনটি ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩১ কিলোমিটার। এই পাইপলাইন প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের মার্চ মাসে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন ডিজেল পরিবহন করা সম্ভব।
দ্রুত সরবরাহ
বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন- সোমবার দুপুর ৩টা ২০ মিনিট থেকে ডিজেল পাম্পিং শুরু হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১৩ মেট্রিক টন হারে ডিজেল পাম্পিং চলছে। এই গতিতে চললে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই পুরো পাঁচ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলাদেশ শুধু পাঁচ হাজার টন ডিজেলেই থেমে থাকতে চাইছে না। রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা। এই অনুরোধটি করা হয়েছিল ৮ মার্চ। সেদিন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় বর্মার সঙ্গে বৈঠক করে এই অনুরোধ জানান।
আগের পরিবহণ ব্যবস্থা
এই পাইপলাইন চালু হওয়ার আগে ভারত থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করা হতো রেলপথে। ২০১৬ সাল থেকে রেল ওয়াগনের মাধ্যমে ডিজেল পরিবহন করা হচ্ছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় সময় ও খরচ অনেক বেশি ছিল। পাইপলাইন চালু হওয়ার ফলে পরিবহন সময় অনেক কমে গেছে এবং খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ভারতের কৌশল
এই প্রকল্পটি ভারতের “Neighbourhood First” নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ সেই কৌশলেরই একটি বড় উদাহরণ।
ভারতের জ্বালানি পরিস্থিতি
এদিকে ভারতের ক্ষেত্রেও জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছে। ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এখনো না বাড়লেও রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে। এছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। এখন থেকে প্রতি ২৫ দিন অন্তর একটি সিলিন্ডার বুক করা যাবে।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একে অপরের উপর আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের মাধ্যমে ভারত শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি পূরণ করছে না, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণও তুলে ধরছে। আগামী দিনে যদি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, তাহলে এই ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে।