সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে ফয়সাল বলেন, সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁকে গুলি করতে দেখা যায়নি। সে ঘটনাস্থলেই ছিল না।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ভোটের আগে বাংলাদেশে উত্তাপ ছিল তুঙ্গে। ক্ষমতা দখল করতে কট্টরপন্থী শিবিরের কার্যকলাপ ছিল বেনজির। এমনই সময় খুন হন ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা তথা কট্টর ভারত বিরোধী ছাত্রনেতা ওসমান হাদি। ছাত্রনেতাকে গুলি করে হত্যায় কার্যত আগুন লাগে দেশজুড়ে। যার শিকার হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা। তারপর ভোট হয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। প্রশ্ন হল, হাদি হত্যাকাণ্ডের কিনারা কবে হবে। হাদিকে কারা মেরেছে ও কেন মেরেছে তার জবাব কবে মিলবে। তবে তদন্ত থেমে নেই। সত্য আর ষড়যন্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই ঘটনা এখন কেবল একটি খুনের তদন্ত নয়। বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রেফতার হওয়া প্রধান আসামীদের বক্তব্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে ধোঁয়াশা। গত বছরের ডিসেম্বরে দিনের আলোয় নামাজ পড়ে ফেরার পথে ঢাকার রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হন তরুণ নেতা ওসমান হাদি। মাথায় গুলি করে দুষ্কৃতীরা মুহূর্তের মধ্যে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষমেশ ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যু হয় তাঁর। এই ঘটনা শুধু একটি খুন নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রশ্ন ওঠে কারা ও কেন টার্গেট করল এই তরুণ নেতাকে।
তদন্তে নেমে বাংলাদেশ পুলিশ প্রথম থেকেই দাবি করেছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়েছে। তৎপর হয় ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির পুলিশ-প্রশাসন। নজরদারি জোরদার করেন পুলিশকর্তারা। মার্চের শুরুতে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স গ্রেফতার করে দুই বাংলাদেশি নাগরিক ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে। জেরায় উঠে আসে হত্যার পর মেঘালয় সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েছিল তারা। তারপর বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে থেকে শেষমেশ বনগাঁয় গা ঢাকা দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ফের চুপিচুপি বাংলাদেশে ঢুকে পড়া। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। আইনের জালে ধরা পড়তেই হয় তাদের। এই তদন্তের মাঝেই উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। নদিয়ার শান্তিপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় এক দালালকে। যে অভিযুক্তদের সীমান্ত পারাপার এবং লুকিয়ে থাকার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। এই গ্রেফতারি ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ এতে স্পষ্ট হয় এই পুরো ঘটনার পেছনে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছিল। যা সীমান্তের দুই প্রান্তেই সক্রিয় ছিল। রবিবার বিধাননগর আদালতে পেশ করা হলে ফয়সাল করিম স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, সে এই খুন করেনি। সে কোনও ভাবেই এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নয়। এমনকি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে ফয়সাল বলেন, সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁকে গুলি করতে দেখা যায়নি। সে ঘটনাস্থলেই ছিল না। তবে তাকে ফাঁসানো হয়েছে কি না এই প্রশ্নে ফয়সাল নীরব থাকে। তার এই অস্বীকারের মাঝেই উঠে আসছে প্রশ্ন, তবে কি প্রকৃত অপরাধীরা এখনও আড়ালেই রয়ে গেছে?
শুধু অস্বীকারই নয় আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করে ফয়সাল। তার দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকতে পারে জামায়াতে ইসলামি ও বিএনপি। এমনকি ওসমান হাদিকে জামায়াতের প্রোডাক্ট এবং জঙ্গি বলেও আক্রমণ করে ফয়সাল। যা এই মামলার রাজনৈতিক মাত্রাকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে, এই মন্তব্য কি আত্মরক্ষার কৌশল, নাকি সত্যিই এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর কোনও রাজনৈতিক ছক? এর আগে ফয়সালের একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভিডিয়ো নাকি দুবাই থেকে বানিয়েছিল ফয়সাল। তা হলে কি সে ভারতে বসেই দুবাইয়ের নাম করে ভিডিয়ো পোস্ট করেছিল ?
বিধাননগর আদালতে দুই অভিযুক্তকে ১৪ দিন জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে এনআইএকে দমদম সংশোধনাগারে গিয়ে তাদের জেরা করার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। বেআইনি কার্যকলাপ আইনের একাধিক ধারাও তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে তদন্তের গুরুত্ব এবং গভীরতার দিকে। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এখন একটি অপরাধ তদন্তের সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে রহস্যে। যেখানে রাজনীতি, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও সত্য অনুসন্ধানের লড়াই একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফয়সালের অস্বীকার, বিস্ফোরক তথ্য ও তদন্তকারীদের ক্রমাগত জেরা। সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই, এই অন্ধকারে কাহিনীর শেষ কোথায়? সত্যিই কি ধরা পড়েছে আসল অপরাধীরা নাকি এখনও পর্যন্ত পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনও চক্রান্ত। ফয়সাল করিম যা বলছে তা কি নিজেকে বাঁচাতে, নাকি সত্যিই জামাত রয়েছে এর পিছনে। এটাই এখন বড় প্রশ্ন।