জালে পুষ্পার স্ত্রী

বদলের বাংলায় পুলিশের বড় সাফল্য, গ্রেফতার ফলতার ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রেজিনা — থানায় হামলার ছক কষার অভিযোগ।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: ফলতা থানায় সংগঠিত হামলা, বিক্ষোভ এবং পুলিশি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় বড় সাফল্য পেল পুলিশ। দীর্ঘ কয়েকদিনের তল্লাশির পর অবশেষে গ্রেফতার করা হল কুখ্যাত জাহাঙ্গীর খানের স্ত্রী রেজিনা বিবিকে। শনিবার সকালে বিষ্ণুপুরের জুলপিয়া এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ধৃত রেজিনাকে এদিন ডায়মন্ড হারবার মহকুমার আদালতে -এ তোলা হচ্ছে। আদালত তাঁর বিষয়ে কী নির্দেশ দেয়, এখন সেদিকেই নজর প্রশাসন এবং রাজনৈতিক মহলের।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ফলতার ‘পুষ্পা’ নামে পরিচিত জাহাঙ্গীর খানকে পুলিশি হেফাজত থেকে জোরপূর্বক মুক্ত করার উদ্দেশ্যে যে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছিল, তার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন রেজিনা বিবি। তদন্তকারীদের দাবি, শুধুমাত্র স্বামীর মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ নয়, গোটা ঘটনাটির পেছনে ছিল সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
অভিযোগ, জাহাঙ্গীর খানকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হয়েছে— এই অভিযোগকে সামনে এনে রেজিনা এলাকায় ক্ষোভ উস্কে দেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বহিরাগতদেরও সংগঠিত করেন। এর পরই শুরু হয় বৃহৎ জমায়েত। সেই জমায়েত থেকে প্রথমে রাস্তা অবরোধ এবং পরে ফলতা থানা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
তদন্তে উঠে এসেছে, হামলার আগের দিন রেজিনা বিবি তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের নিয়ে একটি গোপন বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে থানায় হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় বলে অভিযোগ। পুলিশের দাবি, থানা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সমর্থকদের জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে সংগঠিতভাবে মিছিল করে থানার দিকে এগিয়ে আসে বিক্ষোভকারীরা।
পুলিশের দাবি, উদ্দেশ্য ছিল একটাই— পুলিশ হেফাজতে থাকা জাহাঙ্গীর খানকে যেকোনও মূল্যে মুক্ত করা। সেই লক্ষ্যেই থানার সামনে উত্তেজনা সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা ভাঙন এবং প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করার ছক কষা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের একাংশ থানায় ঢোকারও চেষ্টা করে। অভিযোগ, পুলিশের উপর হামলা, ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।
ঘটনার পর ফলতা থানার পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা রুজু করা হয়। রেজিনা বিবির বিরুদ্ধে (BNS)-এর একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়াও অস্ত্র আইন এবং বিস্ফোরক আইনের অধীনেও কড়া অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় আদালতে পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানানো হতে পারে, যাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
গত ১৭ জুন ফলতা থানায় হামলার ঘটনার পর থেকেই রেজিনা বিবি গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। পুলিশ একাধিক সম্ভাব্য আশ্রয়স্থলে তল্লাশি চালায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়। অবশেষে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বিষ্ণুপুর ও উস্থি থানার সীমান্তবর্তী জুলফিয়া রোড এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকেই তাঁকে আটক করা সম্ভব হয়।
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ২৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের অনুমান, হামলায় আরও বেশ কয়েকজন সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। কারা এই হামলার অর্থ জুগিয়েছে, কারা লোক জড়ো করার দায়িত্বে ছিল এবং কারা মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে— সেই সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই একাধিক মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ভিডিও ফুটেজ এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই গ্রেফতারিকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বিরোধীদের অভিযোগ, ফলতায় দীর্ঘদিন ধরে সমাজবিরোধীদের প্রভাব বাড়ছিল এবং প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছিল। অন্যদিকে শাসকদল দাবি করেছে, আইন নিজের পথেই চলছে এবং অপরাধী যেই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এই বিষয়ে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক দেবাংশু পান্ডা বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। থানায় হামলা, পুলিশকে আক্রমণ কিংবা প্রশাসনের কাজে বাধা— কোনও ঘটনাই বরদাস্ত করা হবে না। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, এলাকায় শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে প্রশাসন সর্বতোভাবে কাজ করছে। পুলিশি তদন্তও দ্রুত এগোচ্ছে। রেজিনা বিবির গ্রেফতার সেই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলেই মনে করছে প্রশাসন।
এখন নজর আদালতের দিকে। পুলিশ রেজিনাকে নিজেদের হেফাজতে চায় কি না, আদালত কী নির্দেশ দেয় এবং তাঁর জেরায় নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না— সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ফলতা থানায় হামলার এই ঘটনায় রেজিনা বিবির গ্রেফতার নিঃসন্দেহে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।