পশুর খাবারেও থাবা মানুষের!

পশুদের জন্য বরাদ্দ খাবার প্রভাবশালী দালালচক্রের কারসাজিতে মাঝপথেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : মানুষের নজর এবার পৌঁছে গিয়েছে পশুদের খাবারের থালায়। খাতায়-কলমে এক ছবি, আর বাস্তবে সম্পূর্ণ অন্য ছবি। মানুষের খাবার এখন দূর। মানুষ হয়ে এবার নজর পশুর খাবারে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বনের রাজা সিংহের জন্য বরাদ্দ খাবারে পড়ছে মানুষের থাবা। মাঝপথেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে পশুদের খাবার। কোথায় ঘটছে এই ঘটনা ? মানুষের খাবার ছেড়ে পশুর খাবারের দিকে লক্ষ্য পড়ল কার ?

একমাত্র সিপাহীজলা জেলায় রয়েছে ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী চিড়িয়াখানা। যেখানে খাঁচায় বন্দি অবলা প্রাণীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ থাকে নির্দিষ্ট টাকা। দৈনিক পুষ্টির জন্য সরকারিভাবে নির্দিষ্ট মানের গো-মাংস বরাদ্দ থাকে। বাঘ ও সিংহের জন্য খাতায়-কলমে উন্নত মানের এবং নির্দিষ্ট ওজনের মাংসের বিল পাশ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই ছবিটা পরিবর্তন হয়ে যায়। এর মধ্যেও উঠে আসছে দালাল চক্রের ছবিটা। পশুদের জন্য বরাদ্দ খাবার প্রভাবশালী দালালচক্রের কারসাজিতে মাঝপথেই গায়েব হয়ে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও বন্যপ্রাণী প্রেমীদের। এই দুর্নীতি কয়েক দশক ধরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে দাবি। প্রশাসন ও সরকারের পরিবর্তন হলেও চিড়িয়াখানার ভেতরের এই অসাধু চক্রের কোনও পরিবর্তন হয়নি। খাঁচায় পৌঁছাচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার। নাম মাত্র ওজনের মাংস। এমনকি পচাবাসী মাংস দেওয়ার কারণে পশু পাখিরা অপুষ্টি ও মারাত্মক গ্যাস্ট্রিকের মতো পেটের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ। সম্প্রতি এখানে কিছু বাঘের বাচ্চার জন্ম হলেও যথাযথ পুষ্টি ও সুরক্ষার অভাবে বন্যপ্রাণী মৃত্যুর ঘটনা বারবার ত্রিপুরার জনগণকে ভাবিয়ে তোলে। বন দফতরের কিউরেটর ও আধিকারিকরা অতীতে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হতে গিয়ে বদলি হয়েছেন বলে অভিযোগ। বর্তমানে বন্যপ্রাণী প্রেমী এবং সচেতন নাগরিকরা সিপাহীজলার এই চরম অব্যবস্থা এবং প্রাণী খাদ্যের নামে কোটি কোটি টাকার কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
খাঁচার অবলা জীবদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধ না হলে সিপাহীজলার পর্যটন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা
অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। যেসব প্রাণী নিজেদের দাবি-দাওয়া নিজেরা জানাতে পারে না, সেই অবলা জীবদের খাবার নিয়েই যদি দুর্নীতির অভিযোগ, তাহলে তা শুধু আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, সরাসরি বন্যপ্রাণীর জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলার সামিল। খাতায়-কলমে বরাদ্দ আর বাস্তবের ছবির মধ্যে এতটা ফারাক কেন, কারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ ওঠার পরেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তা নিয়েই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। এখন নজর তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে। বন্যপ্রাণী প্রেমী, পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সিপাহীজলা চিড়িয়াখানায় প্রাণী খাদ্য সরবরাহ ও ব্যয়ের সমস্ত নথি খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। কারণ, বনের রাজা থেকে খাঁচার প্রতিটি প্রাণীর সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্বই নয়, তা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেরও অন্যতম শর্ত। নইলে খাবারের থালায় দুর্নীতির এই থাবা একদিন অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে।