এবার পুলিশের জালে শেখ হাসিনার প্রাক্তন উপদেষ্টা!

একদিকে বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল। অন্যদিকে একের পর এক পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ। এবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার শেখ হাসিনার প্রাক্তন তথ্য উপদেষ্টা, DBC News-এর চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী। যে মানুষটি একসময় ক্ষমতার অলিন্দে ছিলেন, সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন, আজ তাঁকেই দাঁড়াতে হচ্ছে আদালতের কাঠগড়ায়। প্রশ্ন উঠছে, ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সেই অধ্যায়ের তদন্ত কি এবার পৌঁছে যাচ্ছে আরও এক প্রভাবশালী নামের দরজায়?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

ঢাকার মহাখালীতে DBC News-এর কার্যালয়। বুধবার দুপুর। আচমকাই সেখানে পৌঁছয় গোয়েন্দা পুলিশ। আটক করা হয় ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে। তাঁর সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয় DBC News-এর বিশেষ সংবাদদাতা রাজীব ঘোষকেও। প্রথমে পুলিশের বক্তব্য ছিল, সংবাদ সম্প্রচারকে কেন্দ্র করে কার্যালয়ে একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির কারণেই দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় পরিস্থিতি। ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে যাত্রাবাড়ি থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। আর রাজীব ঘোষকে বন্ডে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।কিন্তু কেন এই গ্রেফতার? কোন মামলায় নাম জড়াল শেখ হাসিনার প্রাক্তন তথ্য উপদেষ্টার?

ঘটনার সূত্র ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালির বউবাজার এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র আরিফ। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই মৃত্যুর ঘটনায় যাত্রাবাড়ি থানায় দায়ের হয় মামলা। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন শেখ হাসিনা-সহ একাধিক ব্যক্তি। আর সেই তালিকায় ৫৩ নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে হেফাজতে রাখার আবেদন জানায় পুলিশ। তবে আপাতত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। আদালতে তাঁর আইনজীবী জামিনের আবেদন করেননি। বরং বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরে কারাবিধি অনুযায়ী বিশেষ ডিভিশনের আবেদন জানান। এখানেই উঠে আসছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক নন। তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা। DBC News-এর চেয়ারম্যান। পাশাপাশি ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ও প্রকাশক।অর্থাৎ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে। এখন সেই পরিচিত মুখই জুলাই আন্দোলনের সময়কার একটি মামলায় অভিযুক্ত। তবে মনে রাখতে হবে, মামলায় অভিযুক্ত হওয়া আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা।

এই গ্রেফতারকে ঘিরে তাই একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে। সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় থেকে একজন প্রবীণ সাংবাদিককে আটক করার পিছনে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল? সংবাদ সম্প্রচারকে কেন্দ্র করে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কথা পুলিশ বলছে, তার বিস্তারিত কী? আর জুলাই আন্দোলনের সময়কার মামলাগুলির তদন্তে আগামী দিনে আরও কোন কোন প্রভাবশালী নাম সামনে আসবে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি। নিহতদের পরিবার এখনও বিচার চাইছে। সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় একের পর এক পরিচিত নামের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ সামনে আসছে। ইকবাল সোবহান চৌধুরীর গ্রেফতারও সেই বৃহত্তর তদন্তেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

যে সময়ের ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি, আজ সেই সময়েরই একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় তাঁকে দাঁড়াতে হচ্ছে আইনের সামনে। কিন্তু এই মামলা কি শুধুই একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, নাকি বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের বিচারপ্রক্রিয়ায় আরও বড় কোনও অধ্যায়ের সূচনা? উত্তর দেবে তদন্ত। আর শেষ কথা বলবে আদালত। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, চলতি বছরের শেষে, অর্থাৎ ডিসেম্বরে যখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চলেছেন, ঠিক তার আগে গ্রেফতার তার প্রাক্তন তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। এর পিছনে রয়েছে কি অন্য কোনও চাল ? থেকেই যাচ্ছে প্রশ্ন।