Khaleda Zia, The Phoenix Rises : দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণে চরম নিঃস্তব্ধতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে।

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। শীতের মরসুমে মোটা কুয়াশার চাদরে ঢেকে গিয়েছিল রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গা। এমন সময় খবর আসে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হয়েছেন। বাংলাদেশের নেত্রী, দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার প্রয়াণের খবর শুধুমাত্র তাঁর জীবনের অবসান নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের টালমাটাল পরিস্থিতির অবসানও বটে। ৪০ বছরের বেশি সময় বাংলাদেশি রাজনীতির কক্ষপথের মধ্যমণি ছিলেন এই খালেদা জিয়া। তাঁর রাজনৈতিক শত্রু শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
খালেদা জিয়াকে বুঝতে গেলে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিষয়গুলি বুঝতে হবে। খালেদা জিয়া ছিলেন একজন লাজুক মহিলা। একজন সেনাকর্মীর স্ত্রী। যিনি রাস্তায় নেমে লড়াই করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সংসদকেও বয়কট করেছেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। একজন সরকারি আধিকারিকের স্ত্রী থেকে বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে তাঁকে। তারপর একেবারে বাংলাদেশের মাদার অফ ডেমোক্রেসি হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া।

১৯৪৫- ১৯৮১ জেনারেলের স্ত্রী
১৯৪৫ সালের ১৫ অগাস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করে খালেদা খানম পুতুল। ইংরেজ শাসিত ভারতের জলপাইগুড়িতে বাড়ি ছিল তাঁর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুরে চলে যায়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক শত্রু শেখ হাসিনার জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি প্রথম থেকেই রাজনৈতিক পরিবারেই বড় হয়েছেন। শেষ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে রাজনৈতিক পরিবারেই জন্ম তাঁর।
খালেদা জিয়া ছিলেন একজন শান্ত স্বভাবের সাধারণ মানুষ। সঙ্গীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল ব্যাপক। রূপেও বেশ সুন্দরী ছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন খালেদা৷ পরবর্তী দশকে একজন সেনা অফিসারের স্ত্রী হিসেবে পশ্চিম এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে শুরু করেন। তাঁর দুই ছেলে তারিক এবং আরাফাতই ছিল তাঁর পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে দূর দূরান্ত পর্যন্ত রাজনীতির ছোঁয়াও ছিল না।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ, প্রথম কারাবাস
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সবটা বদলে গেল। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ যথন জিয়াউর রহমান কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, সামনের সারিতে চলে যান তিনি। খালেদাকে রেখে যান ঢাকায়। প্রায় ৯ মাস ধরে পাক সেনার হাতি বন্দি ছিলেন তিনি। এইসময়েই তাঁর রাজনৈতিক মানসিকতার বিকাশ হয়। একজন তরুণী, যিনি ছিলেন দুই সন্তানের মা। শত্রুর হেফাজতে থেকে সন্তানদের রক্ষা করে গিয়েছেন তিনি। স্বামী জীবিত না মৃত, তাও জানতেন না। সেই প্রথমবার রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে।
ফার্স্ট লেডি খালেদা জিয়া
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। ফার্স্ট লেডি ছিলেন খালেদা জিয়া। একাধিক জায়গায় ফিতে কেটেছেন তিনি। কিন্তু কখনও রাজনৈতিক বক্তৃতা রাখেননি। শিফন শাড়িতে জেনারেলের পাশে দাঁড়ানো একজন নীরব সঙ্গী ছিলেন খালেদা।
জিয়াউর রহমানকে হত্যা
তারপর আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে-র রাত। চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয় জিয়াউর রহমানকে। ৩৫ বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলেন খালেদা।

একজন অনিচ্ছুক নেত্রীর জেগে ওঠার কাহিনী (১৯৮১-১৯৯০)
একজন অনিচ্ছুক নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বিএনপি ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছয়। কারণ খালেদা জিয়ার ক্যারিশ্মাই ছিল দলটির একমাত্র আদর্শ। এবার তো তাও রইল না।
আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির সদস্য হন খালেদা৷ সেই বছরই মার্চ মাসে দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন তিনি৷ এরপর ১৯৮৪ সালের মে মাসে দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে৷ আমৃত্যু সেই পদেই বহাল ছিলেন তিনি৷ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচএম এরশাদের ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আন্দোলন শুরু করেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘোষণা করেন এরশাদ৷ সেই সময় খালেদা জিয়ার বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট এবং হাসিনার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫টি দলের জোট গণতন্ত্রের হয়ে প্রচারে ব্যস্ত ছিল ৷ উভয় জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলেও শেষপর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাকি দলগুলি ৷ সেই সময় গৃহবন্দী করা হয় হাসিনাকে ৷ নির্বাচন বয়কটে স্থির ছিল খালেদার জোট ৷ ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের রাষ্ট্রপতি পদে চলে আসেন এরশাদ৷ ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন পরিচালনা করে৷ নির্বাচনে সকলকে অবাক করে বিপুল ভোটে জয়ী হয় খালেদার দল৷ সংসদ সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসন সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হয়৷ বাংলাদেশের প্রথম এবং পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী পদে আসেন বেগম খালেদা জিয়া ৷ ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া।
হাসিনা বনাম খালেদা জিয়ার লড়াই
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিএনপি ৷ হাসিনার আমলে ২০১৮ সালে ঢাকার একটি আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে খালেদা ৷ প্রথম মামলায় তাঁকে ৫ বছরের এবং পরে দ্বিতীয় মামলায় তাঁকে ৭ বছরের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয় ৷ পরে তাঁর অসুস্থতার জন্য তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় ৷
গত বছর গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে ৷ বাংলাদেশের তৈরি হয় মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ৷ ২০২৪-এর নভেম্বর, খালেদা জিয়ার শাস্তি মকুব করে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান এবং সৈয়দ এনায়েত হোসেনের বেঞ্চ।