যুদ্ধ শুরু হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে- যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দামামা বাজতেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। সরকার আশ্বাস দিলেও শেষমেশ ধাক্কা খেল সাধারণ মানুষই। হঠাৎ করেই ৬০ টাকা বাড়ল রান্নার গ্যাসের দাম। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক গ্যাসের দামও বেড়েছে প্রায় ১১৫ টাকা। এখন প্রশ্ন উঠছে- যুদ্ধের প্রভাব কি ধীরে ধীরে ভারতের ঘরোয়া অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে? আগামী দিনে কি আরও বাড়তে পারে জ্বালানির দাম? কেন বাড়ল গ্যাসের দাম? জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা কতটা বাস্তব? কেন্দ্রের নতুন নির্দেশিকা কী? সাধারণ মানুষের উপর কতটা চাপ বাড়বে? ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি উদ্বেগ
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। এই অঞ্চলের অনেক দেশই বিশ্বের প্রধান তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী। ফলে যুদ্ধ শুরু হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে- যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে। ভারত যেহেতু তার প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশ আমদানি করে, তাই এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতেই কেন্দ্র সরকার জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে একাধিক পদক্ষেপ নেয়।
জারি করা হল জরুরি ক্ষমতা (ESMA)
জ্বালানি সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সেই লক্ষ্যেই কেন্দ্র সরকার জরুরি ক্ষমতা বা ESMA জারি করেছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী- দেশের সব তেল কোম্পানিকে বলা হয়েছে, ঘরোয়া বাজারে রান্নার গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। মূল লক্ষ্য একটি- কোনওভাবেই যাতে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে গ্যাসের সংকট না তৈরি হয়। সরকারের আশঙ্কা, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেকেই আগাম গ্যাস মজুত করার চেষ্টা করতে পারেন। এই পরিস্থিতি সামলাতেই নেওয়া হয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

গ্যাস বুকিংয়ে নতুন নিয়ম
সরকার নির্দেশ দিয়েছে- একটি গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়ার পর ২১ দিন না হলে দ্বিতীয়টির বুকিং করা যাবে না। এখন পর্যন্ত এই সময়সীমা ছিল ১৫ দিন। এই নতুন নিয়মের লক্ষ্য-
প্যানিক বুকিং বন্ধ করা
গ্যাস মজুতের ভারসাম্য বজায় রাখা
এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা
সরকারের দাবি- দেশে গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হঠাৎ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি
দিনভর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আশ্বাস দেওয়ার পর রাতেই এল বড় ঘোষণা। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি জানিয়ে দেয়- গৃহস্থালী রান্নার গ্যাসের দাম ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন-
১৪.২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম
৮৭৯ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৩৯ টাকা।
এই নতুন দাম শনিবার থেকেই কার্যকর। শুধু ঘরোয়া গ্যাস নয়- বাণিজ্যিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১,৮৭৫.৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১,৯৯০ টাকা।
সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব
গ্যাসের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের উপর। মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক খরচ ইতিমধ্যেই বেড়েছে।
খাদ্যপণ্যের দাম
বিদ্যুৎ বিল
পরিবহণ খরচ
সব মিলিয়ে সংসারের বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় আবার রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নতুন করে চাপ বাড়াবে বলেই মনে করছেন অনেকেই।
রেস্তরাঁ ও হোটেল শিল্পে ধাক্কা
বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন- হোটেল, রেস্তরাঁ, রাস্তার ছোট খাবারের দোকান কারণ এই সব জায়গাতেই রান্না হয় বাণিজ্যিক গ্যাসে। গ্যাসের দাম বাড়লে- খাবারের দামও বাড়তে পারে। ফলে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ গ্রাহকদের উপরেও।
সরবরাহে অগ্রাধিকার
তেল কোম্পানিগুলির তরফে জানানো হয়েছে- বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে, তার মাধ্যমে প্রথমে ডোমেস্টিক বা গৃহস্থালী চাহিদা মেটানো হবে। তারপর যদি অতিরিক্ত থাকে, তবেই বাণিজ্যিক সিলিন্ডার দেওয়া হবে। অর্থাৎ- সাধারণ মানুষের রান্নাঘরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে- যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। কারণ—
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে
পরিবহণ খরচ বাড়ছে
সরবরাহ শৃঙ্খলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে
এর প্রভাব পড়তে পারে- রান্নার গ্যাস, পেট্রোল, ডিজেলের দামেও।
নতুন উদ্বেগ – পেট্রোল ও ডিজেল
গ্যাসের দাম বাড়ার পর এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে- আগামী দিনে কি পেট্রোল ও ডিজেলের দামও বাড়বে? বিশেষত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি আরও বাড়ে, তাহলে তার প্রভাব ভারতের বাজারেও পড়তে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে আলোচনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রশ্ন তুলছে- যখন সাধারণ মানুষের উপর চাপ না বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছিল, তখন হঠাৎ করে কেন বাড়ানো হল গ্যাসের দাম? অন্যদিকে কেন্দ্রের দাবি- জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।
তবে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ সূত্রের দাবি, বাস্তবে ভারত কখনওই রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করেনি। এখনও ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। যদিও তেল মন্ত্রক স্বীকার করেছে, গত বছর যেখানে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, সেখানে মার্কিন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার চাপের কারণে তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ও জরিমানার নীতি। রাশিয়ার তেল কিনলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারে ভারতীয় সংস্থাগুলি- এমন আশঙ্কাই বারবার সামনে এসেছে। ফলে একদিকে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আমেরিকার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সামলানো- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদী সরকারের সামনে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল- আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে জ্বালানি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, বরং তা কূটনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। আর সেই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে- ভারত কি ভবিষ্যতেও নিজের স্বার্থ অনুযায়ী তেল কিনতে পারবে, নাকি আন্তর্জাতিক চাপই ঠিক করবে দেশের জ্বালানি নীতি? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনে নির্ধারণ করবে ভারতের জ্বালানি কৌশল ও বৈদেশিক নীতির ভবিষ্যৎ।