কয়েদিদের গাঁথা মালাতেই ৫৩ বছর ধরে পূজিত বিষ্ণুপুরের মা ছিন্নমস্তা

কয়েদিদের হাতে গাঁথা ফুলের মালাতেই নিত্যপুজো! ৫৩ বছর ধরে বিসর্জন হয় না বিষ্ণুপুরের জাগ্রত মা ছিন্নমস্তা কালীর, দীপান্বিতা অমাবস্যায় বিশেষ পুজোয় ভক্তদের ঢল

মিলন কর্মকার নিজস্ব সংবাদদাতা

জেলের কয়েদিদের হাতে গাঁথা ফুলের মালা দিয়েই প্রতিদিন পুজো হয় দেবীর। জেলবন্দি মানুষদের ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক জাগ্রত কালীমন্দিরের ইতিহাস। এখানে দেবীকে পুজো করতে বছরের কোনও বিশেষ দিনের অপেক্ষা করতে হয় না। ৩৬৫ দিনই চলে পুজো-পাঠ। এমনকী, অন্যান্য কালীপুজোর মতো বিসর্জনের রীতিও নেই। সারা বছর মন্দিরের গর্ভগৃহেই বিরাজ করেন মা। বলছি বাঁকুড়া জেলার প্রাচীন মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুরের দলমাদল এলাকার ৫৩ বছরের প্রাচীন জাগ্রত মা ছিন্নমস্তা কালীর কথা।

প্রাচীন রীতি ও ভক্তির পরম্পরা মেনে আজও বিষ্ণুপুর উপসংশোধনাগারের কয়েদিদের হাতে গাঁথা ফুলের মালা পৌঁছে যায় মায়ের মন্দিরে। জানা যায়, সংশোধনাগারের ভিতরে বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ লাগিয়েছেন কয়েদিরাই। সারা বছর সেই গাছের পরিচর্যা, জল দেওয়া থেকে শুরু করে সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা। প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে জেলের ভিতরের বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করেন কয়েদিরা। এরপর নিজেদের হাতে যত্ন করে তৈরি করেন বিশাল আকারের ফুলের মালা। সেই মালা সংশোধনাগারে কর্তব্যরত কোনও পুলিশকর্মীর মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয় মন্দিরের পুরোহিতের হাতে। এরপর সেই মালা দেবীর গলায় পরিয়ে শুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় নিত্যপুজো। পুজো শেষে পুরোহিতের কাছ থেকে প্রসাদও গ্রহণ করেন ওই পুলিশকর্মী। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় পরম্পরা।

মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের কথায়, মা তো সবারই মা। জেলের ভিতরে থাকা কয়েদিরাও ভক্তিভরে মায়ের জন্য ফুল তোলেন, মালা গাঁথেন এবং মায়ের কাছে নিজেদের মনস্কামনা জানান। অনেকেই জেলমুক্তির আশায় মায়ের কাছে মানত করেন। আবার মুক্তি পাওয়ার পর সেই মানত পূরণ করতে মন্দিরে এসে পুজো দেন। কয়েদিদের এই ভক্তি ও বিশ্বাসই যেন মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে এক অন্যরকম আবেগের সম্পর্ক। কারণ জেলের ভেতরে থাকে হিন্দু মুসলিম সব ধর্মের কয়েদি। মায়ের মালা তৈরি করতে সকলেই হাত লাগান।

শোনা যায়, এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনেও রয়েছে এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশের কাহিনি। ১৯৭৩ সালে মেদিনীপুরের বাসিন্দা তথা মৌনিবাবার শিষ্য কৃষ্ণচরণ গুইন একদিন দুপুরে স্বপ্নাদেশ পান। কথিত রয়েছে, স্বপ্নে বামাক্ষ্যাপা ও ভৈরবী মাতা তাঁকে বিষ্ণুপুরের এই স্থানে দেবী ছিন্নমস্তা মায়ের প্রতিষ্ঠা করে পুজো-পাঠ শুরু করার নির্দেশ দেন। সেই স্বপ্নাদেশের পরই ১৯৭৩ সালে বিষ্ণুপুরের দলমাদল এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় মা ছিন্নমস্তা কালীর মন্দির। শুরু হয় নিয়মিত পুজো। সেই সময় থেকেই বিষ্ণুপুর উপসংশোধনাগারের কয়েদিদের হাতে গাঁথা ফুলের মালা মায়ের কাছে পৌঁছনোর পরম্পরা চালু হয় বলে জানা যায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মাহাত্ম্য ও জাগ্রত দেবী হিসেবে পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে বিষ্ণুপুরের গণ্ডি ছাড়িয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকী রাজ্য ও দেশের নানা জায়গায়। বর্তমানে সারা বছরই দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত মন্দিরে এসে পুজো দেন। মন্দিরের বিশেষত্ব হল, এখানে দেবীর বিসর্জন হয় না। সারা বছর গর্ভগৃহেই পূজিত হন মা ছিন্নমস্তা। তবে সারা বছরের নিত্যপুজোর পাশাপাশি দীপান্বিতা অমাবস্যা তথা কালীপুজোর দিন মন্দিরে থাকে বিশেষ আয়োজন। এদিন বিশেষ পুজো-পাঠের পাশাপাশি মন্দিরের গর্ভগৃহে আয়োজন করা হয় হোম-যজ্ঞের। সন্ধ্যারতি ও বিশেষ পুজো দেখতে সকাল থেকেই ভক্তদের সমাগম বাড়তে থাকে। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর। কেউ মায়ের আরতি দর্শন করেন, কেউ পুজো দেন, আবার কেউ নিজের মনস্কামনা পূরণের আশায় দেবীর কাছে প্রার্থনা জানান। একদিকে কয়েদিদের হাতে গাঁথা ফুলের মালা, অন্যদিকে ৩৬৫ দিন ধরে চলা নিত্যপুজো সব মিলিয়ে বিষ্ণুপুরের মা ছিন্নমস্তা কালীমন্দির কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং ভক্তি, বিশ্বাস ও মানবিক অনুভূতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। দীপান্বিতা অমাবস্যায় সেই ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে ঘিরেই ফের ভক্তদের ঢল নামল বিষ্ণুপুরের এই জাগ্রত কালীমন্দিরে।