AI : গ্রাস করছে চাকরি ?

Google DeepMind co-founder Shane Legg : গুগল ডিপমাইন্ডের শীর্ষ কর্তা দাবি করছেন, এআই শুধু চাকরির ধরণ বদলাবে না, ভবিষ্যতে জনপ্রিয় ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থাকেও প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।

 সূচনা পল্যে, সাংবাদিক :   “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই মানুষের চাকরি একে একে কেড়ে নেবে?” – এই প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের প্রথম সারির প্রযুক্তিবিদদের বক্তব্যে সেই আশঙ্কা যেন আরও বাস্তব হয়ে উঠছে। এবার এই নিয়ে মুখ খুললেন গুগল ডিপমাইন্ডের শীর্ষ কর্তা। তাঁর দাবি- এআই শুধু চাকরির ধরন বদলাবে না, ভবিষ্যতে জনপ্রিয় ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থাকেও প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। কেন এমন আশঙ্কা? কোন কোন কাজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে? আর আদৌ কি সবটাই অন্ধকার?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- সংক্ষেপে এআই। যে প্রযুক্তি এক দশকের মধ্যেই বদলে দিয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবন, কাজের ধরন, চিন্তাভাবনার ভাষা। কিন্তু সেই এআই-ই কি এবার মানুষের কাজ কেড়ে নেবে? এই প্রশ্ন প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন নয়। এআই গবেষণার শুরুর দিন থেকেই একাংশের আশঙ্কা ছিল- একদিন মেশিন মানুষের জায়গা দখল করবে। সময় যত এগোচ্ছে, সেই আশঙ্কা ততই বাস্তব হয়ে উঠছে। এবার সেই আশঙ্কায় নতুন করে ইন্ধন দিলেন গুগল ডিপমাইন্ডের যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান এজিআই বিজ্ঞানী শেন লেগ। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত- ভবিষ্যতের কর্মজগৎ আজকের মতো থাকবে না। শেন লেগের মতে, এআইয়ের দাপটে মানুষের চাকরি ও আয়ের কাঠামো আমূল বদলে যেতে চলেছে। এমনকি কোভিড পর্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সংস্কৃতিও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। কোভিড অতিমারির সময় বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরে বসে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। বহু সংস্থা স্থায়ীভাবে রিমোট ওয়ার্ক চালু করেছিল। অফিসের প্রয়োজন কমে গিয়েছিল। কিন্তু শেন লেগ বলছেন- এই ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। তাঁর সাফ কথা,

“যে কাজ শুধুমাত্র কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকে করা যায়। সেই কাজই ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে। অর্থাৎ ডেটা এন্ট্রি, কনটেন্ট তৈরি, রিপোর্ট লেখা, বিশ্লেষণ, গ্রাহক পরিষেবা। এমন বহু কাজই ধীরে ধীরে এআইয়ের দখলে চলে যেতে পারে। এআই ইতিমধ্যেই একাধিক ক্ষেত্রে মানুষকে টপকাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে- ভাষা ব্যবহার, সাধারণ জ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

এই ক্ষেত্রগুলিতে এআই অনেক সময় মানুষের থেকেও দ্রুত ও নির্ভুল হয়ে উঠছে। এখানেই শেষ নয়। তাঁর মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও এক ধাপ এগোবে। যুক্তিপ্রয়োগ, চাক্ষুষ উপলব্ধি এবং ধারাবাহিক শেখার মতো যে সীমাবদ্ধতাগুলি এখনও রয়েছে, সেগুলিও ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠবে এআই। অর্থাৎ ভবিষ্যতের এআই শুধু নির্দেশ মেনে কাজ করা যন্ত্র নয়- বরং নিজে থেকে শেখা, বিশ্লেষণ করা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অর্জন করবে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব কাজ সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে করা সম্ভব, সেগুলির ভবিষ্যৎ সবচেয়ে অনিশ্চিত। ঘরে বসে ল্যাপটপ খুলে যে কাজ করা যায়, সেটিই এআই সহজে নকল বা প্রতিস্থাপন করতে পারে।”

এই বিষয়ে আরও কড়া ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষক অ্যাডাম ডর। তাঁর দাবি, “আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে বর্তমান চাকরির প্রায় সবটাই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি এটাও বলেন, চিত্রটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। তাঁর মতে, অন্তত তিনটি পেশা এখনও এআইয়ের নাগালের বাইরে। সেগুলি হল—

১) রাজনীতিবিদ ২) যৌনকর্মী ৩) নীতি নির্ধারক।

কারণ এই তিনটি ক্ষেত্রেই মানবিক অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা, নৈতিকতা এবং সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- যা এখনও এআই পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না। এআই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আরেক কিংবদন্তি বিজ্ঞানী- জিওফ্রে হিন্টন, যাঁকে অনেকেই “এআইয়ের গডফাদার” বলেন। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি আগেই সতর্ক করেছিলেন- এক সময় মানুষ হয়তো নিজের তৈরি প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। তবে সবাই যে এতটা হতাশ, তা নয়। ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং মেটার প্রধান এআই বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুনের মত ভিন্ন। তাঁদের বক্তব্য- এআই শুধু চাকরি কেড়ে নেবে না, বরং নতুন ধরনের কাজ ও পেশার জন্ম দেবে।

তবে সেই চাকরিগুলি আজকের পরিচিত কাঠামোর মতো হবে না। ভবিষ্যতের কাজ হবে- এআই তত্ত্বাবধান, এআই প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা নির্ধারণ, মানব-এআই সমন্বয়, সৃজনশীল ও কৌশলগত সিদ্ধান্তভিত্তিক কাজ।”

অর্থাৎ মানুষের ভূমিকা বদলাবে, কিন্তু পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না- এমনটাই মত প্রযুক্তিবিদদের একাংশের। সব মিলিয়ে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মজগতের মানচিত্র বদলে দিতে চলেছে- এ নিয়ে দ্বিমত নেই। প্রশ্ন একটাই- এই পরিবর্তন মানুষের জন্য আশীর্বাদ হবে, না অভিশাপ? কেউ বলছেন, এআই মানুষের কাজ কেড়ে নেবে। আবার কেউ বলছেন, এআই মানুষকে আরও দক্ষ করে তুলবে। একদিকে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি- এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র ঠিক কোন পথে যাবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট- এআইকে এড়িয়ে নয়, তাকে বুঝে এবং মানিয়ে নিয়েই আগামী দিনের লড়াইয়ে টিকে থাকতে হবে মানুষকে।