সরকারি ব্যাঙ্কে বেসরকারিকরণের ছায়া?

ইউনিয়নের আশঙ্কা- নেতৃত্বে বেসরকারি মুখ এনে বদলে দেওয়া হচ্ছে পাবলিক সেক্টরের চরিত্র; সরকারের দাবি- এটাই আধুনিকতার পথে পদক্ষেপ।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : একটা সিদ্ধান্ত, যা বদলে দিতে পারে দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ছবি। একটা ঘোষণা, যেটা শুনে কাঁপছে সরকারি ব্যাঙ্কগুলির অন্দর। এটাই কি তবে শুরু? শুরু সরকারি ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণের অধ্যায়? দেখতে স্বাভাবিক- বাইরে গ্রাহকের ভিড়, ভেতরে কাজ চলছে আগের মতোই। কিন্তু এই নীরবতার ভিতরেই নাকি তৈরি হচ্ছে একটা ঝড়। যে ঝড়, কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের নাম করে- সরকারি ব্যাঙ্কের চরিত্রটাই বদলে দিতে পারে। কী সেই সিদ্ধান্ত? কেনই বা কর্মীদের একাংশ একে বলছেন- আবরণে সংস্কার, আসলে বেসরকারিকরণ? সম্প্রতি ভারত সরকার বদলে দিয়েছে ব্যাঙ্কের টপ ম্যানেজমেন্টে নিয়োগের নিয়ম। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী-

স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ও লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের
একাধিক উচ্চপদ এখন খোলা হচ্ছে বেসরকারি প্রার্থীদের জন্য
অর্থাৎ, প্রথমবার সরকারি ব্যাঙ্কের শীর্ষে বসতে পারেন বেসরকারি কর্পোরেট বিশ্বের কর্মকর্তারা। এই নিয়েই ক্ষোভে ফুঁসছে ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলো। ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস অর্থাৎ ইউএফবিইউ- সরকারের এই সিদ্ধান্তকে তীব্র আক্রমণের মুখে তুলেছে। এক ইউনিয়ন মুখপাত্র বলেন-

এটা একটা নীরব দখল
সংসদের অনুমোদন ছাড়া
আইনি কাঠামো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। যখন এই বিতর্কে গরম ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলো, ঠিক তখনই আরেক বড় খবর—

রকার এবার একীভূত করতে চলেছে দুই বড় পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্ক
Union Bank of India ও Bank of India
দুই ব্যাঙ্ককে মিশিয়ে তৈরি হতে চলেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি ব্যাঙ্ক
এই মার্জার সফল হলে ICICI ব্যাঙ্কের থেকে সামান্য পিছনে থাকবে এই নতুন সংস্থা। সরকারের স্পষ্ট যুক্তি- দক্ষতা বাড়ানো, দায় কমানো আর আন্তর্জাতিক মানে দাঁড়াতে পারাই হল এই মার্জারের মূল লক্ষ্য। কিন্তু কর্মীদের প্রশ্ন- দক্ষতার নামে কি তবে শুরু হচ্ছে পাবলিক সেক্টরের ভেতরকার বেসরকারিকরণ?

২০১৭ – ২০২০
এই চার বছরে ১০টি ব্যাঙ্ক একীভূত হয়ে গিয়েছে
তখনই সরকারি ব্যাঙ্কের সংখ্যা কমে ২৭ থেকে নেমে এসেছে ১২-তে
আর এবার সেই ধারাই যেন নতুন করে শুরু হতে চলেছে

এটা শুধুই সংযুক্তিকরণ নয়। এটা ধীরে ধীরে মালিকানা বদলের প্রক্রিয়া। এমনই বক্তব্য প্রাক্তন ব্যাঙ্ক অফিসারের। সূত্রের খবর অনুযায়ী, পরের ধাপে ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক, আর সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াকেও একীভূত করার প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে- যেসব ছোট ব্যাঙ্কের অ্যাসেট তুলনামূলক কম, যেমন-পাঞ্জাব অ্যান্ড সিন্ধ ব্যাঙ্ক বা ব্যাঙ্ক অফ মহারাষ্ট্র- তাদের ভবিষ্যৎ কি তবে প্রাইভেট হ্যান্ডে? অর্থনীতিবিদরা বলছেন—

এটা যদি কেবল গঠনগত পরিবর্তন হয়, তাহলে সমস্যা নেই
কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় নিয়ন্ত্রণ বদলের
তাহলে সেটাই হবে দেশের আর্থিক সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

একটার পর একটা নীতিগত ঘোষণা, একটার পর একটা সংযুক্তিকরণ, সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন একটাই- এটাই কি তবে সরকারি ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা? নাকি- এটাই শুরু, সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে বেসরকারি দখলের নীরব যাত্রা? প্রশাসনের যুক্তি- এটাই আধুনিকতার পথ। অন্যদিকে ইউনিয়নের অভিযোগ- এটা বিশ্বাসঘাতকতা।