কে হামলা চালাল? কেন তাঁকেই টার্গেট করা হল? এবং এর পিছনে কি লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলির অভ্যন্তরীণ সংঘাত?

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের আবহে যখন ক্রমশ ঘনীভূত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যখন প্রতিদিনই আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। ঠিক সেই সময়েই সামনে এল চাঞ্চল্যকর খবর। এবার পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলির অন্দরের অস্থিরতা। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের লাহোরে তেমনই এক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন লস্কর-ই-তইবার সহ প্রতিষ্ঠতা আমির হামজা এই হামলার পর থেকেই জোরালো হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। কে হামলা চালাল? কেন তাঁকেই টার্গেট করা হল? এবং এর পিছনে কি লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলির অভ্যন্তরীণ সংঘাত? দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে এই ঘটনা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। আমির হামজা পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংগঠনের প্রচার, মতাদর্শ বিস্তার ও নেটওয়ার্ক গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ভারতবিরোধী একাধিক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে তাঁর নাম উঠে এসেছে। আমির হামজা কোনও সাধারণ ব্যক্তি নন। লস্কর-ই-তইবার শুরুর সময় থেকেই তিনি সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন।
১৯৮৫ সালে পাঞ্জাবের এক মাদ্রাসায় পড়াশোনার সময় জ়াকি-উর-রহমান লাখভির মাধ্যমে তিনি জঙ্গি মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে হাফিজ সইদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই লস্করের প্রথম কাঠামো গড়ে ওঠে। সংগঠনের প্রচার বিভাগ, নিয়োগ বৃদ্ধি, মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া সব ক্ষেত্রেই হামজার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা ও ভাষণ বহু তরুণকে উগ্রপন্থার পথে টেনে এনেছিল বলেই মনে করা হয়। শুধু প্রচারক হিসেবেই নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাতেও হামজা সক্রিয় ছিলেন। আফগান জিহাদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন চরমপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন এবং ভারতবিরোধী বিষোদ্গার ছিল তাঁর বক্তব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে তিনি শুধু সংগঠনের নেতা নন, লস্করের এক ধরনের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং মতাদর্শিক মুখ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ২০০৫ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে হামলার ঘটনায় তাঁর নাম মূল ষড়যন্ত্রকারীদের তালিকায় উল্লেখ করা হয়। সেই হামলায় এক অধ্যাপকের মৃত্য হয় এবং কয়েকজন আহত হন। ফলে তিনি শুধুমাত্র পাকিস্তানের এক জঙ্গি নেতা নন বরং ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বহু নথিতে গুরুত্বপূর্ণ এক নাম।
তবে গত কয়েক বছরে তাঁর অবস্থান বদলাতে শুরু করে। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লশকর সমর্থিত জামাত-উদ-দাওয়া এবং ফালাহ-ই-ইনসানিয়ত ফাউন্ডেশনের উপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এরপর থেকেই আমির হামজা সংগঠনের মূল নেতৃত্ব থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হাফিজ সইদের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ বাড়ছিল। পরে হামজা নিজস্ব একটি আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করেন যার নাম জইশ-ই-মানকফা। এই পদক্ষেপকে অনেকেই লস্করের ভিতরে বড় ফাটল হিসেবে দেখেন। বর্তমান হামলার ঘটনা সেই দ্বন্দ্বকেই আরও সামনে এনে দিয়েছে। কারণ এটি প্রথম হামলা নয়। গত বছরের মে মাসেও তাঁর উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ হয়েছিল যদিও তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। এক বছরের মধ্যে দুবার হামলা প্রমাণ করছে, তাঁকে ঘিরে বিপদের মাত্রা অনেক বেড়েছে। যদি এটি শুধুমাত্র বাইরের কোনও আক্রমণ হত তবে এত ধারাবাহিকভাবে একই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা হত কি না সেই প্রশ্ন উঠছে। ফলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন সংগঠনের ভেতরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, পুরানো শত্রুতা কিংবা ক্ষমতা পুনর্দখলের লড়াইয়ের জেরেই এই হামলা হতে পারে।
তবে এই হামলার পিছনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে এটি কি বাইরের আক্রমণ, নাকি সংগঠনের ভিতরের ক্ষমতার লড়াই? দীর্ঘদিন ধরেই লস্করের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের খবর সামনে এসেছে। ২৬/১১ মুম্বই হামলার পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও পাকিস্তান বহু সময়েই লোকদেখানো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে অভিযোগ। সেই পরিস্থিতিতে হামজার মতো নেতারা কখনও আড়ালে, কখনও নতুন পরিচয়ে সক্রিয় থেকেছেন। ফলে তাঁর উপর এই হামলা সংগঠনের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফল হতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে। এদিকে ভারতের দিক থেকেও উদ্বেগ কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক জঙ্গি মডিউল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পাঞ্জাব, কাশ্মীর, সীমান্ত এলাকা এবং দেশের বড় শহরগুলিকে ঘিরে সন্ত্রাসী নাশকতার পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলেছে। ড্রোন অনুপ্রবেশ থেকে শুরু করে ধর্মীয় স্থানে হামলার ছক সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট সংবেদনশীল। আমির হামজা যদি এই হামলায় অক্ষম হয়ে পড়েন বা তাঁর অধ্যায় শেষও হয়ে যায়, তবুও হুমকি শেষ হবে না। কারণ জঙ্গি সংগঠনগুলো কখনও একজন ব্যক্তির উপর নির্ভর করে না; পুরনো মুখ সরে গেলে নতুন, আরও উগ্র নেতৃত্ব উঠে আসে। তাই এই ঘটনা যেমন এক বড় ধাক্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনই ভবিষ্যতের আরও বড় অশান্তির পূর্বাভাসও রেখে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রে তাই এই গুলির শব্দ শুধু লাহোরেই থেমে থাকেনি, তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে গিয়েছে গোটা অঞ্চলের কানে।
হামলার পর পাকিস্তান মরকজি মুসলিম লিগ দ্রত প্রতিক্রিয়া জানায়। এই সংগঠনকে হাফিজ সইদের নিষিদ্ধ জামাত-উদ-দাওয়ার রাজনৈতিক ছায়া সংগঠন হিসেবে দেখা হয়। তারা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি তোলে। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়াও অনেকের কাছে কৌশলী পদক্ষেপ বলে মনে হয়েছে। কারণ প্রকাশ্যে নিন্দা জানালেও এর মাধ্যমে তারা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ চাপ কমানোর চেষ্টা করছে কি না সেই প্রশ্নও উঠছে। শুধু আমির হামজা নন, গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে একের পর এক জঙ্গি নেতার রহস্যমৃত্যু হয়েছে। জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারের ভাই মহম্মদ তাহির আনোয়ার রহস্যজনকভাবে নিহত হন। হাফিজ সইদের ঘনিষ্ঠ আবু কাতালকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শেখ জামিল উর রহমানের দেহ উদ্ধার হয়। পঠানকোট হামলার মূল চক্রী শহিদ লতিফও পাকিস্তানের সিয়ালকোটে নিহত হন। এতগুলো ঘটনার পর এটা স্পষ্ট পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গি নেতৃত্ব আর আগের মতো নিরাপদ নয়।
এই ধারাবাহিক হামলার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, সংগঠনগুলির মধ্যে অর্থ এবং প্রভাব বিস্তারের লড়াই। দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার নজরহারি ও গোপন অভিযান। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যাদের একসময় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হত। লাহৌরে আমির হামজার উপর হামলা তাই নিছক একটি অপরাধের টানাপোড়েন। লাহৌরের সেই গুলির শব্দ তাই শুধু একটি হামলার শব্দ নয় এটা একটা সতর্কবার্তা বলাই যায়।