বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। গত প্রায় কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে বলে অভিযোগ রাজ্যের শাসক দলের। এবার সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য নতুন প্রকল্পের সূচনা করতে চলেছে রাজ্য সরকার। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নিজেই একথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সঞ্জু সুর, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ- গত প্রায় কয়েক মাস ধরে অন্য রাজ্যে কর্মরত বাঙালি শ্রমিকদের বারবার হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। বাংলায় কথা বলার অপরাধে তাঁদের ‘অপরাধী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, কখনও মারধর, কখনও মিথ্যা মামলার শিকার হতে হচ্ছে। আর এই ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে। এই অভিযোগ এরাজ্যের শাসকদলের। ভিন রাজ্যে দূর্ভোগের স্বীকার হওয়া সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরাহা দিতে নতুন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, এভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের অপমান আর মেনে নেওয়া যাবে না। তাই তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা ও পুনর্বাসনের জন্য রাজ্য সরকার চালু করল এক বিশেষ প্রকল্প—‘শ্রমশ্রী’।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ করে ডাবল ইঞ্জিন বিশিষ্ট বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে। বাংলায় কথা বলার কারণে তাদের থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে। এমনকি তাদের কাউকে কাউকে বাংলাদেশে পর্যন্ত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলার এইসব পরিযায়ী শ্রমিকরা যারা অন্য রাজ্যে কাজ করেন, বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য যাদের অপরাধী তকমা দেওয়া হচ্ছে, তারা যদি রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গে) ফিরে আসতে চান তাহলে তাদের পুনর্বাসন এর ব্যবস্থা করবে রাজ্য সরকার। সেই কারণেই ‘শ্রমশ্রী’ নামে এই নতুন প্রকল্প করা হলো।” রাজ্য সরকারের হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ২২ লক্ষ বাঙালি শ্রমিক দেশের নানা প্রান্তে বা বিদেশে কাজ করছেন। এঁদের অনেকেই নানা কারণে শিকড়ে ফিরতে চান। কিন্তু কাজ ও জীবিকার অনিশ্চয়তার কারণে বাড়ি ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সমস্যার সমাধান দিতেই নবান্নের নতুন উদ্যোগ।

‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পের প্রধান দিকগুলোর বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী বিশদে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রত্যেক শ্রমিককে ফিরিয়ে আনার পর এককালীন ৫,০০০ টাকা দেওয়া হবে। পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত সর্বাধিক বারো মাসের জন্য প্রতিমাসে আরও ৫,০০০ টাকা ভাতা মিলবে। রাজ্যে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সব পরিযায়ী শ্রমিকদের খাদ্যসাথী ও স্বাস্থ্যসাথী কার্ড করে দেওয়া হবে। যাদের কোনো পাকা বাড়ি নেই তাঁদের জন্য কমিউনিটি কিচেন ও থাকার অস্থায়ী ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়াও বছরের মাঝামাঝি সময়ে ফিরে আসার ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের সন্তানদের পড়াশুনায় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে তার জন্য স্থানীয় এলাকার সরকারি স্কুলে তাদের পঠনপাঠনের ব্যবস্থাও করে দেওয়ার জন্য জেলাশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ইতিমধ্যেই প্রায় ২৭০০ পরিবারকে—অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার মানুষকে—বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এবার বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার জন্য তৈরি হচ্ছে ‘শ্রমশ্রী পোর্টাল’। ওই পোর্টালের মাধ্যমে শ্রমিকরা সরাসরি নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন। এছাড়া স্থানীয় স্তরে চলা ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ শিবিরেও আবেদন জানানো যাবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘এই প্রকল্প মানবাধিকারের প্রশ্নে এক অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। যারা অবহেলিত, অত্যাচারিত, বিপর্যস্ত তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য।’’
পরিষ্কার যে, এই প্রকল্প কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, পরিযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ারও এক বড় প্রচেষ্টা। আর তার মধ্যেই নবান্ন বার্তা দিল—বাংলাভাষী শ্রমিকরা কোথাও অবহেলিত হলে তাঁদের জন্য শেষ আশ্রয় রইল নিজ রাজ্য, নিজ ভূমি।