হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম মহিলা, যার মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির সাজা হল। অতীতে বাংলাদেশে কোনও মহিলার ফাঁসিরা সাজা দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছে শেখ হাসিনাকে। কিন্তু তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, কারচুপির আদালত এই রায় দিয়েছে। জনমত না থাকা এক সরকারের নেতৃত্বে এই ট্রাইবুনাল কাজ করেছে। তাই এই ট্রাইবুনালের কোনও এক্তিয়ারই নেই। মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের খুনি মানসিকতার প্রমাণ এই ফাঁসির সাজা। আত্মপক্ষ সমর্থন ছাড়াই বিচার হয় শেখ হাসিনার। সাজা ঘোষণা হয়েছে তাঁর। কিন্তু এই সাজা ঘোষণার পরেও একাধিক প্রশ্ন থেকে যায়। কি সেই প্রশ্ন… প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আপিলের সুযোগ পাবেন কি হাসিনা? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল- হাসিনা কি বিশেষ কোনও সুবিধা পাবেন? একটু জানিয়ে রাখি হাসিনা হলেন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা, যার মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির সাজা হল। অতীতে বাংলাদেশে কোনও মহিলার ফাঁসিরা সাজা দেওয়া হয়নি।

এবার আসি প্রথম প্রশ্নে, আপিলের সুযোগ পাবেন কি হাসিনা? এক্ষেত্রে প্রসিকিউশন জানায়,শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সোমবার সাজা হলে তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পাবেন না। কারণ তারা পলাতক। ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, অপরাধীকে রায় দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। আপিল করতে হলে অপরাধীকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে। আর অপরাধী যদি গ্রেফতার হন, তাহলেও আপিলের সুযোগ পাবেন তিনি। তাহলে এই সুযোগ হাতছাড়া হাসিনার।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নে। হাসিনা কি বিশেষ কোনও সুবিধা পাবেন? বিশেষ করে নারী হওয়ার জন্য। এই প্রশ্নে প্রসিকিউটর জানান, ফৌজদারি আইনে জামিনের ক্ষেত্রে নারী, অসুস্থ, কিশোর, বালক ও শিশুদের অগ্রাধিকার রয়েছে বা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে রায়ের ক্ষেত্রে নারীকে সাধারণ আইনেও আলাদা কোনও প্রিভিলেজ বা অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না। ট্রাইব্যুনাল আইনেও আলাদা কোনও সুবিধা বা ছাড় নেই মহিলাদের জন্য। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করেই শাস্তি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যেটা দাঁড়াচ্ছে, নারী হওয়ার জন্য হয়তো কিছুটা অগ্রাধিকার পেলেও পেতে পারেন হাসিনা। কিন্তু যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নিয়ে আসা হয়েছে, সেক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ কোনও সুবিধার সুযোগ ৯৯.৯ শতাংশ কম।
হাসিনা দেশের বাইরে থেকেই বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে যদিও দাবি করেছেন, জুলাই আন্দোলনে তিনি কাউকে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দেননি। কিন্তু তাঁর বক্তব্য ট্রাইব্যুনালে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আর তার বক্তব্য যে গ্রহণযোগ্য হবে না সেটা প্রত্যাশিতই ছিল। সেক্ষেত্রে আইনজীবীদের বক্তব্য, হাসিনা সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য জানালে, সেই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। পলাতক অবস্থায় তাঁর বক্তব্য আদালত গ্রাহ্য করতে পারে না।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে, যে আদালত হাসিনাকে ফাঁসির সাজা শোনালো সেই আদালতের কি কোনও বৈধতা রয়েছে? এই আদালত তো গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে অর্থাৎ হাসিনার আমলে। তবে ২০১০ সালে এই আদালত গঠনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জন্য এই আদালত তৈরি করা হয়। ২০২৪-য়ের ৫ অগাস্ট সরকার বদলের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন কর্মসূচির পালন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রথম বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই দিনই অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। একই দিনে জারি হয় গ্রেফতারি পরোয়নাও। ২০২৫ সালের মার্চে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রাক্তন আই.ই.জি.পি-কে আসামী করতে প্রসিকিউশনের করা আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল। এ বছরের মার্চের ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার চিফ প্রসিকিউটরের দফতরে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে হাসিনার সম্পর্কে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা এবং সুপিরিয়র কম্যান্ডার ছিলেন। এর পর ১ জুন শেখ হাসিনা সহ তিন আসামীর বিরুদ্ধে আনু্ষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করা হয়। বাকিটা আপনাদের প্রত্যেকের জানা। এই ট্রাইবুনালের এই ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত জামাত। যারা আবার হাসিনার চরম শত্রু।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল জানিয়েছে, বাজেয়াপ্ত করা হবে হাসিনার সমস্ত সম্পত্তি। তবে শুধু হাসিনা নয়, আসাদুজ্জামানেরও সমস্ত সম্পত্তি এবার বাজেয়াপ্ত করবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু কত সম্পত্তি রয়েছে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর? শেষ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, হাসিনার মোট সম্পত্তির পরিমাণ চার কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা। হ্যাঁ সেটা অবশ্য বাংলাদেশি মুদ্রায়। ভারতীয় মুদ্রায় হিসাব করলে দাঁড়ায়, তিন কোটি ১৪ লক্ষ টাকা। যদিও ইউনুসের শীর্ষকর্তাদের মতে, হাসিনার অলিখিত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খানের সম্পত্তির লিখিত খতিয়ান পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি একটি আর্থিক তছরুপের মামলার তদন্তে নেমে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৬০ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকার অবৈধ সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করেছিল বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক।
এবার আপনার মনে সবথেকে যে প্রশ্নটা উঁকি দেবে সেটা হল ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত হাসিনাকে কি বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতেই হবে ভারতকে? কী বলছে আইন, কী কী রয়েছে দু’দেশের চুক্তিতে…বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন শেখ হাসিনা। সাজা ঘোষণার পরেই অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, হাসিনাকে ফেরাতে চেয়ে ফের ভারতের কাছে চিঠি দেবেন তাঁরা। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যেটা থাকে। ওই চুক্তি অনুযায়ী আদালতের রায়ে প্রত্যর্পণ করানোর মতো অপরাধ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এক দেশ অপর দেশের হাতে তুলে দেবে। কোনও দেশের অন্তর্বর্তী সরকার অন্য রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের কাছে কোনও রাজনৈতিক নেতার প্রত্যর্পণ চাইলে,অবশ্যই আইনি দিকগুলি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমেই আসি, ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি কি বলছে। ২০১৩ সালে মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-সরকারের আমলে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে বলা হয়,
আদালতের রায়ে প্রত্যর্পণ করানোর মতো অপরাধ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এক দেশ অপর দেশের হাতে তুলে দেবে। ন্যূনতম এক বছরের জেল হতে পারে, এমন অপরাধ করে থাকলেও সেই ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা হবে। অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া বা সাহায্য করা ব্যক্তিকেও প্রত্যর্পণ করা যেতে পারে বলে জানানো হয় চুক্তিতে। ২০১৬ সালে এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে তুলতে ওই চুক্তি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত চুক্তিতে বলা হয়, কারও নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই তাঁকে প্রত্যর্পণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধের প্রমাণস্বরূপ কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে হবে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও কিন্ত একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। সংশোধিত চুক্তি অনুসারেই তাঁকে প্রত্যর্পণের আর্জি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এবার আসি ভারত কি করবে ? ভারত কি হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, না, ভারত হাসিনাকে ফেরাতে বাধ্য নয়। সোমবারের রায়ের পর বাংলাদেশে হাসিনার প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ওই চুক্তিতে থাকা নিয়ম অনুসারেই ভারত হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়। তাছাড়া চুক্তিতে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, অপরাধীর যদি রাজনৈতিক চরিত্র থাকে, তা হলে প্রত্যর্পণ করা হবে না। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সেখানে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে যে, বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না। আর হাসিনা বারবার বলছেন, ইউনুসের ষড়যন্ত্রের শিকার তিনি।