ঘুমের ওষুধ খাচ্ছেন ? বড় বিপদ ডেকে আনছেন!

ঘুমের ওষুধের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা আসলে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটা বিস্ফোরক সম। যার বিস্ফোরণ ঘটলে এলোমেলো হয়ে যাবে সবকিছু।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : এই মুহূর্তে আমরা এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করি যার সুইচ অফ কখনও হয় না, এই ব্যস্ত দুনিয়া থেকে এক মিনিটও পিছিয়ে পড়লে খেই হারিয়ে যাবে খুব সহজেই। তাই সারাদিন কাজ শেষে রাতের যে শান্তির ঘুম তা এখন বিলুপ্তপ্রায়। রাতে শুতে গিয়েও হাতে মোবাইল, স্ক্রোলিং চলছে সব জায়গায় আর এই মুহূর্তে বেশির ভাগ মানুষই ভুগছেন ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রায় আর তাই সমধান কি হবে? কেন একটা ছোট্ট সাদা বড়ি মেডিক্যালি যার নাম ঘুমের ওষুধ বা স্লিপিং পিল, ঘুমোতে চেয়েও না ঘুমোতে পেরে যাকে হাতে তুলে নিলেই কয়েক মুহূর্তে এসে যাবে সেই বহু প্রতীক্ষিত ঘুম। কিন্তু যাকে শান্তির ঘুম বলা হচ্ছে তা কি আদৌ শান্তির? স্লিপিং পিলসের হাত ধরে আপনি আদৌ ঘুমাচ্ছেন নাকি ঘুমের নামে ডেকে আনছেন বড় বিপদ? মাঝে মধ্যে এক আধটা ওষুধ যদি আপনি খান তাহলে তা কিন্তু শরীরে তেমন প্রভাব ফেলে না কিন্তু আপনি যদি একে বন্ধু বানিয়ে ফেলেন বানিয়ে ফেলেন অভ্যাস তাহলেই কিন্তু বিপদ। কারণ এই ওষুধের হাত ধরে আমরা কিন্তু আদৌ ঘুমাচ্ছি না আমরা রাসায়নিকভাবে আমাদের মস্তিষ্কের কাঠামো পরিবর্তন করছি। ঘুমের ওষুধের ওপর এই ক্রম বর্ধমান নির্ভরতা কিন্তু অনিদ্রার কোন প্রতিকার করছে না উল্টে এই নির্ভরতা আসলে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটা বিস্ফোরক সম যার বিস্ফোরণ ঘটলে এলোমেলো হয়ে যাবে সব কিছুই। একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন তো আপনি কি সত্যিই ঘুমোচ্ছেন নাকি নিজেকে আচ্ছন্ন করে রাখছেন?

অনেকেই হয়ত জানেন না ঘুমের ওষুধ আমাদের ঘুম এনে দেয় না বরং বেশ অনেক ক্ষণের জন্য আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে আর এই ঘুম বনাম আচ্ছন্নতার এই মিথ কিন্তু ভবিষ্যতের এক বড় অশনি সংকেত। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, ঘুমের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। শুরুতেই খুব গভীর ঘুম আসে না। ধীরে ধীরে ঘুম গভীর ও গাঢ় হয়।ঘুম চক্রের প্রথম পর্যায় হল ঘুমের সবচেয়ে হালকা পর্যায় এবং সাধারণত প্রায় সাত মিনিট স্থায়ী হয়। ঘুমন্ত ব্যক্তি কিছুটা সতর্ক থাকে এবং সহজেই তাকে জাগিয়ে তোলা যায়। এই পর্যায়ে, হৃদস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে যায় এবং পেশীগুলি শিথিল হতে শুরু করে। দ্বিতীয় ধাপে, মস্তিষ্ক “স্লিপ স্পিন্ডলস” নামে পরিচিত বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপের সংক্ষিপ্ত বিস্ফোরণ তৈরি করে যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপের রেকর্ডিংয়ে একটি স্বতন্ত্র করাতের দাঁতের ধরণ তৈরি করে। অবশেষে, তরঙ্গগুলি ধীর হতে থাকে। দ্বিতীয় ধাপকে এখনও ঘুমের একটি হালকা পর্যায় হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তবে ঘুমন্ত ব্যক্তির জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। হৃদস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস আরও ধীর হয়ে যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। এই পর্যায়টি প্রায় ২৫ মিনিট স্থায়ী হয়।এই পর্যায়টি শরীরকে গভীর ঘুমে পতিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ধীরগতির ঘুম হয়। মস্তিষ্ক ধীরগতির ডেল্টা তরঙ্গ তৈরি করে এবং ঘুমন্ত ব্যক্তির চোখের নড়াচড়া বা পেশীর কোনও কার্যকলাপ হয় না। মস্তিষ্ক আরও বেশি ডেল্টা তরঙ্গ তৈরি করার সাথে সাথে, ঘুমন্ত ব্যক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধারমূলক ঘুমের পর্যায়ে প্রবেশ করে যেখান থেকে জাগ্রত হওয়া কঠিন। গভীর ঘুমের এই পর্যায়টিই আপনাকে সকালে সতেজ বোধ করতে সাহায্য করে। এটি এমন একটি পর্যায় যেখানে আপনার শরীর পেশী এবং টিস্যু মেরামত করে, বৃদ্ধি এবং বিকাশকে উৎসাহিত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে।ঘুমিয়ে পড়ার প্রায় ৯০ মিনিট পর, আপনার শরীর REM ঘুমে প্রবেশ করে, যা হল Rapid Eye Movement sleep এবং আপনার চোখের পাতার পিছনে দ্রুত এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরির জন্য এই নামকরণ করা হয়েছে। REM ঘুম শিশুদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়, যা ব্যাখ্যা করতে পারে কেন শিশুদের প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি REM ঘুমের প্রয়োজন হয়। এই ঘুমের ধরণটি স্বপ্ন দেখার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, কারণ এই পর্যায়ে আপনার মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় থাকে। শারীরিকভাবে, আপনার শরীর দ্রুত এবং অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি অনুভব করে; তবে, আপনার বাহু এবং পায়ের পেশীগুলি সাময়িকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা আপনাকে আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে বাধা দেয়। প্রতিটি নতুন ঘুম চক্রের সাথে REM ঘুম বৃদ্ধি পায়, প্রথম চক্রের সময় প্রায় দশ মিনিট থেকে শুরু হয় এবং শেষ চক্রে এক ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এবার এত খটনি কিন্তু ঘুমের ওষুধ একেবারে করে না, এটা খাওয়ার পরে সরাসরি সে আপনাকে আচ্ছন্ন করে দেয় আর আপনি ভাবেন আপনি ঘুমালেন। এই আচ্ছন্ন ভাবের কারনে আপনার ব্রেন টক্সিন সরিয়ে দিতে গভীর যে তরঙ্গ লাগে সেখানে প্রবেশে বাধা পায়, এই কারণেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে আপনি যখন পরের দিন সকালে অঠেন আপনার মধ্যে কিন্তু যে টায়ার্ড নেস বা ক্লান্তি ভাব সেটা অক্ষুণ্ণ থাকে কারণ আগের রাতে শরীরে জমা টক্সিন তো রয়েই গেছে, বিষয়টা অনেকটা মোবাইলের মত, আপনি হোয়াটস আপের চ্যাট ডিলিট করেননি শুধু অফলাইন ছিলেন। আর এভাবেই বাড়ছে ঝুঁকি গবেষণায় দেখা গেছে যে এই সমস্ত ড্রাগ ব্যবহার করে ডিমেনশিয়া এবং আলঝাইমারসের মত রোগের সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। শুধু তাই নয় এই ওষুধগুলি স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপকেও দুর্বল করে দেয়। নতুন স্মৃতি তৈরিতে ব্যর্থ হতে থাকে মস্তিষ্ক, আপনি হইয়ত ভাবছেন মাথা ভার লাগছে এক কাপ কড়া করে কফি হলে মন্দ হত না কিন্তু আদতেও তা নয়, আসলে ধীরে ধীরে চাপ বাড়ছে আপনার মস্তিষ্কের কোষ গুলির ওপরে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন যে স্লিপিং পিলসের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতা মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তন করে যা আশ্চর্য জনক ভাবে মস্তিষ্ককে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়। শুধু কি তাই! এই ওষুধগুলোর সবচেয়ে বড় নেগেটিভিটি কি জানেন এরা খুব দ্রুত কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা যায় যে ডোজ নিয়ে আপনি এতদিন ঘুমাচ্ছিলেন সেই ডোজ নিয়ে আর ঘুম আসছে না। ফলে আপনার প্রইয়োজন আরও বাড়তি ডোজ যা ওই নেশার সমান বলাই যায়। এবার অনেকে ভাবেন এই ওষুধ নির্ভর ঘুম থেকে বেড়িয়ে আসবেন কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক ততদিনে এই বিষয়টাকে এডপ্ট করে ফেলেছে, ফলে সে যে স্বাভাবিক ভাবে ঘুমের ক্ষমতা তাকে হারিয়ে ফেলেছে, অতএব ফিরে এল সেই ইনসোমনিয়া শুধুই ফিরল তা কিন্তু নয়, আগের চেয়ে প্রায় দশ গুণ তীব্রতায় ফিরল। এর হাত থেকে মুক্তি পেতে আবার আপনি ফিরলেন সেই মারণ ওষুদের কাছেই, বুঝতে পারছেন ঠিক কোন ভয়াবহ ফাদে আপনি পড়ে গিয়েছেন। আর ঘুমের ওষুধ তো শুধুই রাতের সঙ্গে জড়িয়ে নেই, দিনের যাপনকেও তো এটা প্রভাবিত করে, দিনের বেলায় যখন আপনি কাজ করছেন আপনার শরীরে এই অষুধ তো তখনও তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে ফলে আপ্নি যে ক্লান্ত বোঢ করবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। এর ফলে জীবন সংশয়ও তো বাড়ছে মনে করুন ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাতে ঘুমিয়েছেন পরেরদিন সকালে উঠেছেন আচ্ছন্ন ভাব কাটেনি সেই অবস্থাতেই যদি আপনাকে গাড়ি চালাতে হয় তাহলে যে কোন মুহূর্তে এক্সিডেন্ট তো হতেই পারে। দেখুন আমরা যখন স্বাভাবিক ভাবে ঘুমোচ্ছি তখন আমাদের ব্রেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে এলারমের কাজ করে সেই ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিচ্ছে যা ওষুধ করে না বরং এটা আপনার মন তৈরি করে একটা অবসাদ গ্রস্ত অনুভূতি যাকে ক্লান্তি বলে ভুল করছেন আপনি। তাই অবিলম্বে জীবন থেকে বাদ দিতে হবে এই স্লিপিং পিলসকে কিন্তু তাহলে ইনসোমনিয়া? তার কি হবে? চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন এর জন্য বিহেভিয়ারাল থেরাপি রয়েছে কিন্তু ভুলেও ঘুমের ওষুধের দিকে তাকাবেন না। দেখুন নিয়ম মেনে ঘুম কিন্তু সুস্বাস্থ্যের জন্য খুব জরুতি তাকে ওষুধ কেন্দ্রিক করে তোলা মানে নিজেরই ক্ষতি। তাই বেড়িয়ে আসুন চেষ্টা করুন, আজ থেকেই ধীরে ধীরে এক সুস্থ স্বাভাবিক ঘুমের। আমার বিশ্বাস আপ্নি পারবেন।