রাহুল গান্ধীর SIR মামলার শুনানি পিছোল সুপ্রিম কোর্টে!

ভারতের নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের দায়ের করা আবেদনের শুনানি পিছিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্টে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার সংশোধন বা SIR-এর নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে নির্বাচন কমিশন। এই প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ১১ জন নেতা। যেখানে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের নির্ভরযোগ্যতা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তাঁরা অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবিও জানিয়েছিলেন তাঁরা।সেই মামলার ১৩ ই অক্টোবর শুনানির কথা থাকলেও আবেদনটিতে কিছু ত্রুটি থাকার কারণে শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দেশের শীর্ষ আদালত।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রি রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী জোটের করা এসআইআর সংক্রান্ত আবেদনে মোট ১৪টি ত্রুটি বা ঘাটতি পেয়েছে। ত্রুটিগুলো সংশোধন না করা পর্যন্ত মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হবে না।যার মধ্যে অন্যতম আদালতে ফি বাবদ ২২০ টাকা কম জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাডা়ও রাহুল ও খাড়গেকে বাদ দিয়ে অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, সুপ্রিয়া সুলে, সৌগত রায়ের মত ৯ জন আবেদনকারীর যথাযথ ওওকালতনামা বা অনুমতিপত্র ও সাক্ষর ছিল না। ওকালতনামা হলো আদালতের একটি আইনি দলিল , যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি আদালতে নিজের পক্ষে মামলা পরিচালনা করার জন্য একজন আইনজীবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা প্রদান করেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিচয়পত্রের অস্পষ্ট ফটোকপি দেওয়া হয়েছিল। আবেদনে কিছু পৃষ্ঠা অনুপস্থিত ছিল কিংবা কিছু লেখা অস্পষ্ট ও পড়া যাচ্ছিল না। নথিপত্র ছোট ফন্টে তৈরি করা হয়েছিল এবং রঙিন কপির অভাব ছিল।পৃষ্ঠা নম্বরে অসংগতি ছিল এবং আঞ্চলিক ভাষার নথি ইংরেজি অনুবাদ ছাড়া জমা দেওয়া হয়েছিল।জনস্বার্থ মামলার ধরনের রিট আবেদনে ব্যক্তিগত পক্ষ যেমন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারসহ বাকি নির্বাচন কমিশনারদের আলাদাভাবে প্রতিপক্ষ করার বিষয়ে রেজিস্ট্রি প্রশ্ন তুলেছে আবেদনকারীদের আইনি দল ত্রুটি শোধরানোর পর বুধবার মামলাটি তালিকাভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে কি চাওয়া হয়েছিল আবেদনপত্রে,লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী শিবিরের আরও ১০ জন নেতা সোমবার এই আবেদনটি দায়ের করেন। এতে ‘রেসপন্ডেন্ট’ বা বিবাদী হিসেবে ভারতের নির্বাচন কমিশন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কমিটি গঠনের আর্জি জানানো হয়েছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং তালিকায় সংশোধনের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।আবেদনটিতে আরও অনুরোধ করা হয়েছে যে, উত্থাপিত বিষয়গুলোর বিষয়ে আদালত কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত যেন বিভিন্ন রাজ্যে চলমান SIR প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।আবেদনকারীরা এমন নির্দেশের দাবি জানিয়েছেন যাতে কোনও ভোটারকে পূর্ব-নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের বা বক্তব্য উপস্থাপনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া ছাড়া তালিকা থেকে বাদ না দেওয়া হয়। পাশাপাশি, পাঞ্জাব ও নির্বাচনমুখী অন্যান্য রাজ্যে যোগ্য ভোটাররা যাতে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়েছে।ন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে- তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের নাম, নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান বুথ-ভিত্তিক প্রকাশ করা। সেই সঙ্গে যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি ব্যবস্থা চালুর আর্জি জানানো হয়েছে।

এই আবেদনে এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে জড়িত ফাইল, আলোচ্যসূচি, সভার কার্যবিবরণী, অভ্যন্তরীণ নোট এবং আপত্তিগুলো তলব করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া, এতে ইসিআইনেট ও ইরোনেট সিস্টেমের প্রাসঙ্গিক অ্যাক্সেস লগ এবং ২০২৫ সালের ২৪ জুনের সিদ্ধান্ত-সংক্রান্ত সম্পূর্ণ ফাইলটিও চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারীরা আদালতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন খতিয়ে দেখা হয় যে, ওই সিদ্ধান্তগুলো সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকাল) আইন, ২০২৩’-এর ১৮ ধারা এবং প্রযোজ্য বিচারিক রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।আবেদনে নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য দায়ী কর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ করা হয়েছে- যার মধ্যে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০’-এর ৩২ ধারার অধীনে ব্যবস্থা গ্রহণও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তা প্রযোজ্য।এতে অনলাইন ‘ফর্ম ৬’-এর মাধ্যমে ভোটার নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়েছে, যাতে তা ‘ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা, ১৯৬০’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় ।বেদনে পাঞ্জাবের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় দেখা গিয়েছে যে, ওই বছরের জুন মাসে নথিভুক্ত প্রায় ২.১৪ কোটি ভোটারের তালিকা থেকে প্রায় ২০.৬৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে।আবেদনকারীদের যুক্তি হল, এইধরনের অনিয়ম নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং যোগ্য নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন ও ভোট প্রদানের অধিকার নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও তীব্র করতে রাহুল গান্ধী এবং অন্যান্য শীর্ষ বিরোধী নেতারা সোমবার হাজার হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ‘ গণতন্ত্রের জন্য পদযাত্রা’ করেন এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনার বিরুদ্ধে এই যৌথ আবেদন দাখিল করেন।
এদিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার জন্যও সময় চেয়েছিলেন রাহুলেরা। তবে সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি কান্ত। রাহুল এবং মল্লিকার্জুন খড়্গেকে চিঠি পাঠিয়ে প্রধান বিচারপতি জানিয়ে দেন, যে অভিযোগগুলির কথা রাহুলেরা বলছেন, সেই সংক্রান্ত মামলা শীর্ষ আদালতে ইতিমধ্যে বিচারাধীন রয়েছে। তাই আদালতের বাইরে তা নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়।তবে এই প্রথম কোনও বিষয় নিয়ে বিরোধী নেতারা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পদযাত্রা করেন।

রাহুল গান্ধীর আইনি দল জানিয়েছে যে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম মেনে এই ত্রুটিগুলো সংশোধন করার কাজ চলছে। আইনি ত্রুটিগুলো দ্রুত দূর করার পর আবেদনটি পুনরায় তালিকাভুক্ত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে পেশ করা হবে। প্রধান বিচারপতি (সিজেআই) সূর্য কান্ত অবশ্য এর আগে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে আবেদনটি যথাযথ আইনি উপায়ে দাখিল করা হলে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা হবে। এখন দেখার পদ্ধতিগত এই জটিতলা কাটিয়ে কবে আবেদন জমা করে বিরোধীপক্ষ। কমে শুনানি দিন ধার্য করে আদালত।