বাংলাদেশে ভোটের আগে ফের হিন্দু নিধন!

মাত্র সাত মাস বাংলাদেশজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ১১৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোট। তার আগে ফের প্রতিবেশী দেশে ঝড়ল রক্ত। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশে ফের হিন্দু খুন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকেই রণক্ষেত্র হয় বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মহম্মদ ইউনুস দায়িত্ব নিলেও কট্টরপন্থীদের দাপাদাপি কমেনি কোনও দিক থেকেই। সম্প্রতি ছাত্রনেতা ওসমান হাদি খুনের ঘটনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় সংবাদমাধ্যমের দফতরগুলিতে। এমনকী অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটে যায়। কট্টরপন্থীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছায়ানটও। সেখানেও রাতভর চলে তাণ্ডব। এখানেই শেষ নয়, সংখ্যালঘু হিন্দু যুবক দীপু দাসকে গণপিটুনির পর তাঁর দেহ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে ইউনুসের দেশে। ঘটনায় কেঁপে ওঠে গোটা বিশ্ব। তারপর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসেছে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার খবর। এই পরিস্থিতিতে ভোটমুখী বাংলাদেশে ফের খুন হলেন এক সংখ্যালঘু ।

ভোটের ঠিক ৪৮ ঘন্টা আগে ফের রক্ত ঝরল এক হিন্দু ভাইয়ের। বাংলাদেশে ফের সংখ্যালঘু নিধন। দীপু চন্দ্র দাস, মনি চক্রবর্তী, খোকন দাস, অমৃত মণ্ডল, বজেন্দ্র বিশ্বাসের পর এবার সুসেন চন্দ্র সরকার। ময়ময়নসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ নামে একটি চালের দোকান ছিল তাঁর। সেখানেই দোকান বন্ধ করার সময়ে সোমবার রাত এগারোটা নাগাদ সুসেনকে কুপিয়ে খুন করা হয়। পুলিশের দাবি, সুসেন সরকার তাঁর দোকানের ভেতরে ছিলেন। তখন কিছু অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতী ধারাল অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁকে হত্যা করার পর,হামলাকারীরা দোকানের শাটার নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ বা HRCBM-র তরফে এক রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। যেখানে বলা হয় মাত্র সাত মাস। মানে ২০২৫ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ১১৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই এই হিংসার ঘটনা দেশব্যাপী মারাত্মক রূপ নিয়েছে। হত্যাকাণ্ডগুলি বাংলাদেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগ এবং অন্তত ৪৫টি জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে হত্যা করা হয় ১০ জন হিন্দুকে। খুন হওয়া হিন্দুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দীপু চন্দ্র দাস এবং অমৃত মণ্ডল। তাঁদের নৃশংস খুনের ঘটনায় ভারতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছিল। এদিকে ডিসেম্বরে চুরি ও ডাকাতি ১০টি, বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-মন্দির ও জমিজমা দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ২৩টি ঘটনা রয়েছে। এছাড়া ধর্মীয় অবমাননা ও দালালের মিথ্যা অভিযোগে আটক ও নির্যাতন ৪টি, ধর্ষণ চেষ্টা ১টি, দৈহিক নির্যাতন ৩টি। জানুয়ারিতে বাংলাদেশে খুন অন্তত ৭ জন হিন্দু। বাংলাদেশে ২ জানুয়ারি থেকে ৭ জন হিন্দুকে খুন করা হয়। এর আগে ৫ জানুয়ারি ২ জন হিন্দুকে খুন করা হয় বাংলাদেশে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী নর‌সিংদী‌তে খুন করা হয় হিন্দু ব্যবসায়ী শরৎ চক্রবর্তী ম‌ণিকে, যশোরে গুলি করে খুন করা হয় হিন্দু ব্যবসায়ী তথা সাংবাদিক রানাপ্রতাপ বৈরাগীকে। ২ জানুয়ারি খুন হয়েছিলেন সত্য রঞ্জন দাস। ৩ জানুয়ারি খুন হন মিলন দাস এবং সনু দাস। গত ৩১ ডিসেম্বরে হামলার শিকার খোকন চন্দ্র দাস। মৃত্যু হয় ৩ জানুয়ারি। ৪ জানুয়ারি খুন হন শুভ পোদ্দার।

HRCBM-র রিপোর্টে বলা হয়, মোট মৃত্যুর ৪৮.৩ শতাংশই লক্ষ্যভিত্তিক হামলা। গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১০.৩ শতাংশ, সন্দেহজনক বা অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়েছে ১২.৯ শতাংশের। পুলিশি হেফাজতে বা পুলিশি অত্যাচারে মৃত্যু হয়েছে ৬.৯ শতাংশ, আর সেনা বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮.৬ শতাংশ মানুষ। এই হত্যাকাণ্ডগুলিকে কোনওভাবে সাধারণ অপরাধ বলে খাটো করে দেখা যায় না।

১৯৪৬ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ, যা ২০২০ সালে নেমে এসেছে ৯ শতাংশেরও নিচে। এই দীর্ঘমেয়াদি পতন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা হিংসার প্রতিফলন বলে দাবি করা হয় রিপোর্টে। প্রতিবেদনে এই হিংসার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়। দাবি করা হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন কোনও নতুন ঘটনা নয়, বরং প্রায় আট দশক ধরে চলে আসা এক ধারাবাহিক সংকট। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে শুরু করে ১৯৫০, ১৯৬৪ ও ১৯৭১ সালে ব্যাপক হিংসা, উৎখাত ও সম্পত্তি দখলের ঘটনা ঘটে। স্বাধীনতার পরেও ১৯৮৯, ১৯৯০, ২০০১, ২০০৪, ২০১২, ২০১৫, ২০২১, ২০২৪ এবং বর্তমানে ২০২৫ সালেও একই ধরনের হিংসা দেখা যায় বলে উল্লেখ করা হয়।

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। এই আবহে উঠছে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, খুন, ভাঙচুর ও ভয়ভীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিরোধী দল বলছে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। অন্যদিকে সরকার বলছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে , বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে উঠে আসছে একেবারে অন্য ছবি। বিশেষ করে নির্বাচন পূর্ব ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ অতীতে একাধিকবার উঠেছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুরা সফট টার্গেট হয়ে উঠতে পারে. কারণ তারা সংখ্যায় কম ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ভোটব্যাঙ্ক হিসেবেই ধরা হয়। গত ছ মাসে কয়েকটি এলাকায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সময় সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ অভিযোগ ওঠে। তবে এইসব ঘটনায় স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, ভোটের আগে ভয় দেখানোই ছিল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয় যেখানে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেখানে মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক, সংখ্যালঘু নিরাপত্তায় বিশেষ নজরদারি, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোনও গুজব ছড়ালে, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে নজরকাড়া। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে। দণ্ডবিধি ও বিশেষ আইনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তার প্রয়োগ বা কার্যকর হয় কতটা ? ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরীক্ষা। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অধিকার।