ভারতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে ছাড়পত্র পেল আরও ৪ দেশ।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ঢেউ এসে এখন সরাসরি লেগেছে ভারতের হেঁশেলে ও পেট্রোল পাম্পে। এই পরিস্থিতিতে সংসদে নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য আলোড়ন ফেলেছে দেশজুড়ে। বলেছেন, দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে হবে । রাজ্যগুলিকে কেন্দ্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। আর এই কথার পর মানুষের মনে একটাই বড় প্রশ্ন। দেশ কি আবার লকডাউনের পথে যাচ্ছে। তবে এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি, উদ্বেগ ও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বাড়ছে আতঙ্ক। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ মানে শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের মতো দেশের উপর। কারণ ভারত জ্বালানির জন্য অনেকটাই নির্ভরশীল অন্য দেশের উপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর উপর। এই পথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের গ্যাস ও তেল সরবরাহ হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলছে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যুদ্ধ। বিগত কয়েক সপ্তাহে একাধিকবার সে দেশের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচির সঙ্গে কথা বলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। শুধু তা-ই নয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেসকিয়ানের সঙ্গেও কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এর মাঝে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনেই স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হরমুজ অবরুদ্ধ করে গোটা বিশ্বের উপর আরও চাপ বাড়িয়ে যাবে তেহরান। তার জেরে গোটা বিশ্বে তেল এবং গ্যাস সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এমন হুঙ্কার দেওয়া সত্ত্বেও ভারতকে আলাদা ছাড়পত্র দেয় ইরান। কিন্তু এবার তেহরান সরাসরি জানিয়ে দেয়, হরমুজ ভারতের জন্য মুক্ত। কিন্তু ভারত ছাড়া এই তালিকায় রয়েছে কোন কোন দেশ ? কে কে পেল ইরানের থেকে ছাড়পত্র ?
দুদিন আগেই রাষ্ট্রসংঘে ইরান জানায়, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল বাদে বাকি দেশগুলির জাহাজকে যাতায়াতের ছাড়পত্র দেওয়া হলেও কিছু শর্ত ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রসংঘকে তারা জানায়, যে সব জাহাজকে ইরান নিজের শত্রু বলে মনে করবে না, তারাই হরমুজ় দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। একইসঙ্গে এও বলা হয় ওই জাহাজগুলি যেন ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণে জড়িত না থাকে, বা মদত না দেয়। ওই অঞ্চলে ইরানের ঘোষিত নিরাপত্তা এবং সুরক্ষাবিধিও সম্পূর্ণ ভাবে মেনে চলতে হবে ওই জাহাজগুলিকে।

মিত্র দেশগুলির জন্য হরমুজ প্রণালী মুক্ত রেখেছে ইরান। সেই তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ভারত। জ্বালানী সংকটের মধ্যে এটি এক বড় স্বস্তি। একটি সাক্ষৎকারে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ নেই। ইরানের সঙ্গে যে কয়েকটি দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তাদের জাহাজগুলিকে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
১৬৭ কিলোমিটার লম্বা হরমুজ প্রণালী পারস্য মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে ভারত মহাসাগরকে। এই প্রণালীর উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে সংযুক্ত আরবআমিরশাহী এবং ওমান। হরমুজের গড় প্রস্থ ২১ কিমি। বিশ্বের দৈনিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়, যা দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সমান। এটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ততম সামুদ্রিক তেলপথ এবং এশিয়া, ইউরোপ ও তার বাইরের দেশগুলো এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি জলসড়ক হিসেবে ব্যবহার করে। তেল ছাড়াও, এটি বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি চালানের একটি বড় অংশ পরিচালনা করে। এই প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত এলএনজি-র প্রায় ৮৩% জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চিনের মতো এশীয় বাজারে যায়। এটি পূর্ব দিকে জ্বালানি রফতানির জন্য একটি দ্বৈত-ভূমিকার করিডোর হিসেবে কাজ করে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ ভারত-ইরান জ্বালানি বাণিজ্য। সম্প্রতি ফের ইরানের তেলের ওপর থেকে সাময়িক ভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে আমেরিকা। এই আবহে ভারত-ইরান জ্বালানি বাণিজ্য আবার শুরু হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ৩০ দিনের জন্য ইরানের তেল রফতানির ওপর ছাড় দিয়েছে। ভারতের বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্কার নিরাপদে পাড়ি দিয়েছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। তবে হরমুজ প্রণালীতে এখনও আটকে বিভিন্ন দেশের শয়ে শয়ে ট্যাঙ্কার এবং জাহাজ।
ভারত ছাড়াও হরমুজ প্রণালীতে ছাড়পত্র পেল আরও ৪ দেশ। তালিকায় রয়েছে রাশিয়া, চিন, ইরাক এবং পাকিস্তান। যদিও সম্প্রতি এক রিপোর্টে দাবি করা হয়, একটি পাকিস্তানি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিল ইরান। হরমুজ প্রণালী পেরোতে গেলে কার্যত দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় জাহাজটিকে। জাহাজটি আইনি প্রোটোকল মানেনি, হরমুজ পেরনোর অনুমোদনও ছিল না বলে জানানো হয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে করাচির দিকে এগোচ্ছিল কন্টেনার ভর্তি ওই জাহাজটি, যার নাম সেলেন। হরমুজে ঢোকার ঠিক মুখে জাহাজটিকে আটকে দেয় ইরান। মুখ ঘুরিয়ে ফিরে যেতে বলে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস। এতে অস্বস্তিতে পড়ে পাকিস্তান। কারণ আমেরিকার সঙ্গে ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তারা।