কীভাবে ধরা পড়ল হাদি? ঘাতক ফয়সল ও আলমগীর ?

এসটিএফের দাবি, ঢাকায় ওসমান হাদিকে খুনের পর চোরাপথে মেঘালয়ে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল দুই খুনি।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : সীমান্ত পেরিয়ে অপরাধীরা অনেক সময় মনে করে আইনের হাত থেকে এড়ানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তো সেই হিসেব সব সময় মেলে না। বাংলাদেশে আলোড়ন তোলা তরুণ রাজনৈতিক নেতা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সেই কথাই আবার সামনে এল। দীর্ঘদিন ধরেই এই খুনের অন্যতম প্রধান অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল দুই দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি। অবশেষে সেই তল্লাশির বড় সাফল্য পেল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স সীমান্তবর্তী বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে এই মামলার অন্যতম প্রধান অভিযু্ক্ত ফয়সাল মাসুদ করিমকে। শুধু তিনি একাই নন, তার সহযোগী এবং একই মামলার আর এক অভিযুক্ত আলমগীর শেখও এসটিএফের জালে ধরা পড়েছেন। এসটিএফের দাবি, ঢাকায় ওসমান হাদিকে খুনের পর চোরাপথে মেঘালয়ে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল দুই খুনি। বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ হয়ে ট্রেনে ও বাসে করে এসে পৌঁছয় বনগাঁ সীমান্তে। এসটিএফের দাবি, ফের চোরাপথে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালানোর ছক ছিল তাদের। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার গভীর রাতে সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে এসটিএফ। ফয়সাল করিম বাংলাদেশের পটুয়াখালি ও আলমগির হোসেন ঢাকার বাসিন্দা।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটে নাগাদ নমাজ পড়ে ফেরার পথে ঢাকার অদূরে পুরাতন কালভার্ট রোডে প্রকাশ্যে গুলিতে খুন হন বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা তথা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ ওসমান হাদি। তা নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। হাদি হত্যাকাণ্ড ভোটমুখি বাংলাদেশের বেহাল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নগ্ন ছবি তুলে ধরেছিল। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক স্তরেও যথেষ্ট আলোড়ন তোলে। সূত্রের দাবি, ওসমান হাসি রিকশা করে ঢাকার সূর্যোদয় উদয়নের দিকে যাচ্ছিলেন। বিজয়নগর জলের ট্যাঙ্কের কাছে যানজটের কারণে রিকশার গতি ধীর হয়ে যায়। সেই সুযোগে বাইক চালক আলমগির রিকশার পাশে আসে। পিছনে বসেছিল ফয়সাল করিম। সে পকেট থেকে নাইন এমএম পিস্তল বের করে হাদির মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আহত হাদিকে চিকিৎসকার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি কোমায় থাকাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়। পরে কাজী নজরুল ইসলামের পাশেই হাদিকে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের গোয়েন্দারা দুই খুনের অভিযুক্তকে শনাক্ত করে দাবি করেন যে, ফয়সাল ও আলমগির আওয়ামী লীগের কর্মী। বাইকে করেই তারা ঢাকার বাইরে পালিয়ে যায়। এরপর পাঁচবার গাড়ি পাল্টে তারা পৌঁছয় ময়মনসিংয়ের হালুয়াঘাট সীমান্তে। রাতের অন্ধকারে বিএসএফের চোখ এড়িয়ে তারা পৌঁছয় মেঘালয়ে। রাজ্যের গোয়ান্দাদের কাছে খবর ছিল যে, সেখান থেকে উত্তর-পূ্র্ব ভারতের একাধিক রাজ্যে তারা ভুয়ো পরিচয়ে ডেরা বাঁধে। ক্রমে উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রেন ও বাস পাল্টে পৌঁছয় বনগাঁয়। শনিবার রাতে গ্রেফতারের পর রবিবার বনগাঁ আদালতে তোলা হলে তাদের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়।

এক কর্তা জানান, কিছু দিন আগে গোয়েন্দারা জানতে পারেন বাংলাদেশে তোলাবাজি ও খুনের সঙ্গে জড়িত দুজন বাংলাদেশি অবৈধ ভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে এবং বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। ওই খবরের ভিত্তিতে খোঁজ চালিয়ে ওই দুজনকে শনিবার রাতে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের রবিবার আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদেক ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের রাখার নির্দেশ দেয়। এসটিএফের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পরে ধৃতরা স্বীকার করেছে, রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগির হোসেন বাংলাদেশের ঢাকায় ওসমান হাদিকে খুন করে পালিয়ে মেঘালয়ে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল। তবে করে মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল। সেই ব্যাপারে গোয়েন্দারা কিছু বলতে চাননি। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, বনগাঁ ছায়া বারাসত-সহ এ রাজ্যের নানা জায়গায় অভিযুক্তেরা থেকেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। জেরা করে সেই জায়গাগুলি জানার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ওই খুনের ঘটনায় প্রায় ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছিল। গত মাসে হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয় ঢাকা পুলিশ। এদিকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশউপ হাইকমিশন জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই ভারতের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ধৃতদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কনস্যুলার অ্যাকসেস চেয়ে নয়াদিল্লির কাছেও আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত আইনের জাল এড়ানো গেল না। এই গ্রেফতার সেই বার্তাই আবার স্পষ্ট করে দিল। বহু আলোচিত ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এই গ্রেফতারকে বড় অগ্রগতি বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। এখন দুই দেশের প্রশাসনের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তই নির্ধারণ করবে এই চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য কত দ্রুত সামনে আসবে।