“আটকে দেব সব জাহাজ”-হুঙ্কার ট্রাম্পের !

ইরান অবৈধভাবে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে, অভিযোগ ট্রাম্পের।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক, নিজস্ব সংবাদদাতা : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে এবার বড়সড় উত্তেজনা তৈরি হল আন্তর্জাতিক মহলে। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আমেরিকার কড়া অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির উপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বেরোনোর চেষ্টা করা সমস্ত জাহাজকে আটক করবে মার্কিন নৌবাহিনী। আন্তর্জাতিক জলপথে এই ধরনের পদক্ষেপ যে কতটা গুরুতর, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। রবিবার ট্রাম্প নিজেই সমাজমাধ্যমে এই ঘোষণা করেন। তিনি দাবি করেন, ইরান নাকি অবৈধভাবে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে। তাঁর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা অনেক জাহাজ ইরানকে ‘টোল’ দিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। সেই কারণেই মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমন জাহাজগুলিকে চিহ্নিত করে আটক করতে।

শুধু তাই নয়, ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরান নাকি হরমুজ প্রণালীতে মাইন পেতে রেখেছে এবং সেই অজুহাত দেখিয়ে পুরো জলপথের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে। তাঁর হুঁশিয়ারি, যদি ইরান কোনও মার্কিন জাহাজ বা শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা চালায়, তাহলে তার জবাব অত্যন্ত কঠোরভাবে দেওয়া হবে। এই ঘোষণার ঠিক আগেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল। প্রায় ২০ ঘণ্টা ধরে চলা সেই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটানো এবং শান্তি সমঝোতার পথ খুঁজে বের করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠক ভেস্তে যায়।

আমেরিকার তরফে জানানো হয়েছে, ইরান আলোচনায় সহযোগিতা করতে রাজি হয়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স, যিনি এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের অনমনীয় মনোভাবের কারণেই আলোচনা সফল হয়নি। অন্যদিকে, ইরান সম্পূর্ণ উল্টো দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, আমেরিকা এমন কিছু শর্ত চাপিয়ে দিতে চাইছিল যা দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানান, তারা ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল, কিন্তু আমেরিকা তাদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তারা জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

তবে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আমেরিকান সেন্ট্রাল কম্যান্ড ঘোষণা করেছে, সোমবার ইউরোপীয় সময় সকাল ১০টা থেকে ইরানের সমস্ত বন্দর কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ইরানের বন্দর থেকে কোনও জাহাজ ঢোকা বা বেরোনো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইরান ছাড়া অন্য দেশের জাহাজগুলিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। কিন্তু তবুও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ঠিক সেটাই ঘটেছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। এক ধাক্কায় প্রায় ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০২ ডলারেরও উপরে পৌঁছে যায়।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ভারতের মতো দেশ, যারা তেলের জন্য আমদানির উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও চিন্তার। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। কারণ তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই সব কিছুর দাম বাড়ার সম্ভাবনা। এদিকে ভারতীয় সময় অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে হরমুজ প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে আটকানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড়সড় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পুরো পরিস্থিতি শুধুমাত্র সামরিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি লাইফলাইন। এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের নজর পশ্চিম এশিয়ার দিকে। সবাই অপেক্ষা করছে, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। একদিকে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা, অন্যদিকে বাড়তে থাকা উত্তেজনা- এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।