আতসকাচের তলায় IDFC First Bank দুর্নীতি!

৩৯১টি সন্দেহজনক লেনদেন, সরকারি দফতরের টাকায় প্রায় ৫৯০ কোটি টাকার গরমিল।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : হরিয়ানায় সামনে এসেছে এক বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি। সরকারি দফতরের টাকায় প্রায় ৫৯০ কোটি টাকার গরমিল। অভিযোগের কেন্দ্রে একটি বেসরকারি ব্যাঙ্ক। IDFC First Bank। ৩৯১টি সন্দেহজনক লেনদেন। ১৭০টি অ্যাকাউন্ট। সরকারি দফতরের অর্থ। আর তদন্তে উঠে আসছে জাল সই, শেল কোম্পানি, এবং কোটি কোটি টাকার ফান্ড ডাইভার্সনের অভিযোগ। কীভাবে ফাঁস হল এই কেলেঙ্কারি? কারা জড়িত? কোথায় গেল টাকা? এবং এখন তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে?

কীভাবে সামনে এল কেলেঙ্কারি?

ঘটনার সূত্রপাত হরিয়ানার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পঞ্চায়েত ডিপার্টমেন্টে। দফতরটি ৫০ কোটি টাকা জমা রেখেছিল IDFC First Bank-এ। আর ২৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল AU Small Finance Bank-এ। ১৩ জানুয়ারি ২০২৬-এ দফতর নির্দেশ দেয়- দুটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে সুদ-সহ সমস্ত টাকা Axis Bank-এ ট্রান্সফার করতে। AU Small Finance Bank প্রায় ২৫.৪৬ কোটি টাকা ট্রান্সফার করে দেয়। কিন্তু IDFC First Bank? ৫০ কোটির বদলে মাত্র ১.২৭ কোটি টাকা পাঠানো হয়। এখানেই শুরু সন্দেহ।

তদন্ত কমিটি গঠন

১১ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়- একজন অতিরিক্ত ডিরেক্টর, একজন ডেপুটি ডিরেক্টর এবং একজন অ্যাকাউন্টস অফিসারকে নিয়ে। তাদের তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য-
একাধিক চেক প্রসেস করা হয়েছে
ডেবিট নোট জারি হয়েছে
অথচ কোনও অনুমোদন ছিল না
জাল সই ব্যবহার করা হয়েছে

জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ

রিপোর্টে বলা হয়েছে- তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল, IAS অফিসার ডি কে বেহরার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়- তিনি ২৮ অক্টোবর ২০২৫-এ দায়িত্ব ছাড়ার পরেও তাঁর নামে লেনদেন হয়েছে। এমনকি একটি চেকে অঙ্কে লেখা ২ কোটি ৫০ লক্ষ, কিন্তু কথায় লেখা- “Rupees Twenty-Five”। তারপরও ব্যাঙ্ক সেই চেক প্রসেস করেছে। কমিটির ভাষায়- এটি “malafide intention”-এর ইঙ্গিত।

৪৬.৫৬ কোটি কোথায় গেল?

তদন্তে দেখা যায়- IDFC First Bank থেকে প্রায় ৪৬.৫৬ কোটি টাকা ট্রান্সফার হয়েছে AU Small Finance Bank-এ। সেখান থেকে টাকা যায় একটি বেসরকারি সংস্থায়- Swastik Desh Projects-এ। তদন্তকারী সংস্থার দাবি- প্রায় ৩০০ কোটি টাকা শেষ পর্যন্ত ওই সংস্থার অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছিল, তারপর আরও বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ঘোরানো হয়।

কারা গ্রেফতার?

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ গ্রেফতার করা হয় চারজনকে-


রিভভ ঋষি- IDFC First Bank-এর প্রাক্তন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার
অভয় কুমার- প্রাক্তন রিলেশনশিপ ম্যানেজার
স্বাতী সিংলা- অভয়ের স্ত্রী
অভিষেক সিংলা- স্বাতীর ভাই
গ্রাফিক্স আউট

অভিযোগ- শেল কোম্পানি তৈরি করে জাল চেকের মাধ্যমে অর্থ সরানো হয়েছে।

তদন্তে নামছে ভিজিল্যান্স (গ্রাফিক্স হেড)

কমিটির রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়েছে হরিয়ানা স্টেট ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরোর হাতে। এফআইআর দায়ের হয়েছে। ব্যাঙ্ক কর্মী ও অজ্ঞাত সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

৩৯১টি সন্দেহজনক লেনদেন (গ্রাফিক্স হেড)

এই কেলেঙ্কারিতে- ৩৯১টি জাল বা অনুমোদনহীন লেনদেন, ১৭০টি অ্যাকাউন্ট, প্রায় ৫৯০ কোটি টাকার গরমিল দেখা যায়। একটি বড় প্রশ্ন উঠছে- ব্যাঙ্কের ইন্টারনাল কন্ট্রোল সিস্টেম কোথায় ছিল?

ব্যাঙ্কের প্রতিক্রিয়া

IDFC First Bank জানিয়েছে- এই জালিয়াতি নির্দিষ্ট কয়েকটি অ্যাকাউন্টেই সীমাবদ্ধ। ক্ষতিগ্রস্ত হরিয়ানা সরকারী দফতরকে ৫৮৩ কোটি টাকা, মূলধন ও সুদ, ফেরত দেওয়া হয়েছে। চারজন আধিকারিককে ইতিমধ্যেই সাসপেন্ড করা হয়েছে।

ফরেন্সিক অডিট

একটি ফরেন্সিক অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে KPMG-কে। তারা খতিয়ে দেখবে- টাকা কীভাবে সরানো হল, কে অনুমোদন দিল, সিস্টেমে কোথায় ফাঁক ছিল।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়াব সিং সাইনি জানিয়েছেন- বেশিরভাগ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিরোধীরা সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছে। তাদের প্রশ্ন- এটি কি শুধু কয়েকজন ব্যাঙ্ক কর্মীর কাজ? নাকি বড় কোনও যোগসাজশ?

এখন বড় প্রশ্ন- এত বড় অঙ্কের লেনদেন নজর এড়াল কীভাবে? জাল সই দিয়ে একের পর এক চেক প্রসেস হল কেন? সরকারি তহবিল সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি? কোনও সরকারি কর্মী জড়িত ছিলেন কি?
৫৯০ কোটির এই কেলেঙ্কারি শুধু একটি ব্যাঙ্ক জালিয়াতি নয়। এটি প্রশ্ন তুলছে সরকারি অর্থের নিরাপত্তা, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ইন্টারনাল কন্ট্রোলের কার্যকারিতার উপর। যদিও ব্যাঙ্ক দাবি করছে অধিকাংশ অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে, তবুও তদন্তে যদি আরও গভীর ষড়যন্ত্র উঠে আসে, তাহলে এই মামলা দেশের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে পরিণত হতে পারে। তদন্ত চলছে। পরবর্তী আপডেটের দিকে নজর থাকবে সবার।