গত ভোটে ৭৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ছিল তৃণমূলের একচ্ছত্র দাপট !

৭৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ভোট হয়েছিল ৭২ কেন্দ্রে। ৬৯টিতেই তৃণমূল জয়লাভ করে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক: ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এই ৭৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ছিল তৃণমূলের একচ্ছত্র দাপট। যেখানে সংখ্যালঘু মুসলিম জনসংখ্যা ৪০% থেকে ৯০%-এর মধ্যে। এই কেন্দ্রগুলো শুধু সংখ্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ছিল। উত্তর দিনাজপুর থেকে মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা। ২০২১-এর ফলাফলের দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায় এই ৭৪টি কেন্দ্রের অধিকাংশই জয় পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ইসলামপুর, হরিরামপুর, ডোমকল, জঙ্গিপুর, ভতরপুর, বসিরহাট কিংবা বজবজ। একটির পর একটি কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিরোধীরা কিছু কেন্দ্রে লড়াই দিলেও সংখ্যার বিচারে তারা পিছিয়েই ছিল। সেখানে একতরফাভাবে প্রাধান্য ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। কিন্তু এবার ছবিটা আগের মতো থাকবে কি ? এসআইআর হয়ে যাওয়ার পর প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

এসআইআরের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ভোটার তালিকায়। নতুন ভোটার যুক্ত হওয়া, মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ পড়া, ভুল সংশোধন। সব মিলিয়ে এক নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনই রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে এই ৭৪টি কেন্দ্রে। সেখানে ভোটার তালিকার বদল বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দেখে নেওয়া যাক ৭৪টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ২০২১-এর বিশেষ কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রের ফল…


সুজাপুর
সংখ্যালঘু ভোটারঃ ৮৮%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ১,৩০,১৬৩

(২০২১ সালের হিসাব)

বসিরহাট উত্তর
সংখ্যালঘু ভোটার ৬৮%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৮৯,৩৫১

( ২০২১ সালের হিসাব)

হাড়োয়া
সংখ্যালঘু ভোটার ৫৮%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৮০,৯৭৮

(২০২১ সালের হিসাব)

কলকাতা পোর্ট
সংখ্যালঘু ভোটার ৪৩%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৬৮, ৫৫৪

(২০২১ সালের হিসাব)

নলহাটি
সংখ্যালঘু ভোটার ৬৭%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৫৬,৯০৫

(২০২১ সালের হিসাব)

ডোমকল
সংখ্যালঘু ভোটার ৮৮%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৪৭,২২৯

(২০২১ সালের হিসাব)

কালীগঞ্জ
সংখ্যালঘু ভোটার ৫৫%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৪৬,৯৮৭

(২০২১ সালের হিসাব)

ইসলামপুর
সংখ্যালঘু ভোটার ৭২%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ৩৭,৪৪০

( ২০২১ সালের হিসাব)

হরিরামপুর
সংখ্যালঘু ভোটার ৪৯%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ২২,৬৭২

(২০২১ সালের হিসাব)

চাপড়া
সংখ্যালঘু ভোটার ৬০%
জয়ী তৃণমূল
জয়ের ব্যবধান ১২,১১৮

(২০২১ সালের হিসাব)

ভাঙড়
সংখ্যালঘু ভোটার ৬৮%
জয়ী আইএসএফ
জয়ের ব্যবধান ২৬,১৫১

(২০২১ সালের হিসাব)

বহরমপুর
সংখ্যালঘু ভোটার ৫৩%
জয়ী বিজেপি
জয়ের ব্যবধান ২৬,৮৫২

(২০২১ সালের হিসাব)

মুর্শিদাবাদ
সংখ্যালঘু ভোটার ৫৩%
জয়ী বিজেপি
জয়ের ব্যবধান ২,৪৯১

(২০২১ সালের হিসাব)

রেজিনগর, জঙ্গিপুর, ভরতপুর, বেলডাঙা, নাকাশিপাড়া, তেহট্ট, করিমপুর, কেতুগ্রাম, পাঁচলা, মুরারই, চাকুলিয়া, গোয়ালপোখর, বসিরহাট দক্ষিণ, মিনাখাঁ, মগরাহাট

৭৪টি কেন্দ্র
৭২টি কেন্দ্রে ভোট হয়
তৃণমূল জয়ী ৬৯
বিজেপি ২

আইএসএফ ১

২০২১ সালের সেই ৭৪টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রের পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যার হার ৪০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ সেখানে ভোটের ফলাফল এক বিশেষ প্রবণতার দিকে ছিল। একইভাবে দক্ষিণ দিনাজপুরে হরিরামপুরে ৪৯ শতাংশ,মালদার চাঁচল ৭০ শতাংশ, সুজাপুরে ৮৮ শতাংশ এই কেন্দ্রগুলিতেও তৃণমূলের শক্তিশালী অবস্থান চোখে পড়ে। মুর্শিদাবাদ জেলার চিত্র আরও স্পষ্ট ডোমকল ৮৮ শতাংশ, জঙ্গিপুর ৭০ শতাংশ, ভরতপুর ৫৫ শতাংশ, রেজিনগর ৫৯ শতাংশ, বেলডাঙা ৭৫ শতাংশ। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রেই তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছে। নদিয়ার করিমপুর ৪৫ শতাংশ, তেহট্ট ৪০ শতাংশ, কালীগঞ্জ ৫৫ শতাংশ, নাকাশিপাড়া ৪৭ শতাংশ। এই কেন্দ্রগুলিতেও শাসকদল জয়লাভ করেছিল। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট দক্ষিণ ৫০ শতাংশ, হাড়োয়া ৫৮ শতাংশ, মিনাখাঁ ৫০ শতাংশ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্ব ৬৩ শতাংশ, মগরাহাট পশ্চিম ৫৬ শতাংশ। পূর্ব বর্ধমান কেতুগ্রামে ৪৫ শতাংশ। হাওড়ার পাঁচলায় ৪৩ শতাংশ। বীরভূমের মুরারইয়ে ৬৮ শতাংশ, তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ৯৮,২৪৬। সব ক্ষেত্রেই তৃণমূলের প্রাধান্য ছিল এই কেন্দ্রগুলিতে।

এই ৭৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬৯টিতেই তৃণমূল জয়লাভ করে। ভোট হয়েছিল ৭২ কেন্দ্রে। যেখানে বিজেপি পেয়েছে ২টি আসন এবং সংযুক্ত মোর্চা ১টি। ৫০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা বিশিষ্ট কেন্দ্রগুলিতে তৃণমূলের ধারাবাহিক জয় প্রমাণ করে যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক তখন একমুখী ছিল। বিরোধীরা আশা করছে এসআইআরের মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন ভোটার তালিকা তাদের জন্য কিছুটা হলেও সুযোগ এনে দেবে। বিশেষ করে যেখানে তারা আগেরবার খুব কাছাকাছি লড়াইয়ে হেরেছিল। অন্যদিকে তৃণমূলও চাইবে তাদের পুরানো ভোটব্যাঙ্কের ফলাফল ধরে রাখতে ও নতুন ভোটারদের মধ্যেই প্রভাব বাড়াতে। প্রশ্ন উঠছে ২০২১-এর সেই চেনা ফল কি আবার ফিরবে। নাকি এই ৭৪টি কেন্দ্রেই লেখা হবে এক নতুন রাজনৈতিক গল্প। সেটা তো জানা যাবে ৪ মে।