রুবিওকে স্পষ্ট বার্তা জয় শঙ্করের, জ্বালানি সঙ্ক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত নেবে দিল্লিই

আর প্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ রাশিয়ার তেল নিয়ে এবার সরাসরি ‘রেড লাইন’ টেনে দিল ভারত! ওয়াশিংটনের চাপ, ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের হুমকি—কিন্তু দিল্লির বার্তা স্পষ্ট, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবে ভারতই। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে মার্কো রুবিওকে সেই বার্তাই আরও একবার জানিয়ে দিলেন এস জয়শঙ্কর। নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৈঠকে রাশিয়ার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নতুন আইন নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ফের স্পষ্ট করেন জয়শঙ্কর।
আলোচনার কেন্দ্রে লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬। মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া এই আইনের উদ্দেশ্য ইউক্রেনে হামলার জেরে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো। এই আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলির পণ্যে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— আইন পাস হওয়া মানেই ভারতের উপর সঙ্গে সঙ্গে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে যায়নি। প্রয়োগের সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রশাসনের হাতে। রুশ তেল পরিবহণে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত ‘shadow fleet’ বা জাহাজগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে এই বিলে। পাশাপাশি রাশিয়ার নেতৃত্ব, ব্যাঙ্ক এবং জ্বালানি খাতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার লক্ষ্য রয়েছে।
ভারতের আপত্তি কোথায়? ভারতের জ্বালানি সংগ্রহের সিদ্ধান্ত দেশের জাতীয় স্বার্থ ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী হবে। বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, ১৪০ কোটির মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ভারতের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে শুধু রাশিয়া নয়, বিকল্পও খুঁজছে ভারত। ভারত একইসঙ্গে তেলের উৎসে বৈচিত্র্য আনছে। আগস্টে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি প্রায় ১৬.৫% কমে ২১ লাখ ব্যারেল/দিনে নেমেছে; সেপ্টেম্বরে আরও কমার প্রাথমিক ইঙ্গিত রয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ উৎস হয়ে রয়েছে। নভেম্বরে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৫ থেকে ১০৯ ডলার ছিল, সেই দাম ইতিমধ্যেই ঠেকেছে ১৩৫ থেকে ১৪০ ডলারে। কোনও কোনও পরিশোধনাগারকে সেই তেল কিনতে দিতে হচ্ছে ১৫০ ডলারও। অন্যদিকে রাশিয়ান তেলের দাম যেখানে আগে ব্যারেল প্রতি ১৫ থেকে ২০ ডলার ছাড় মিলত, এখন সেই তেলের দামও বেড়ে হয়েছে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার থেকে ১১২ ডলারের আশেপাশে। দাম বাড়লেও পশ্চিম এশিয়া থেকে কেনা তেলের থেকে রাশিয়ান তেলের দাম এখনও অনেকটা কম। আগস্টে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী ছিল।
২০২২ সালে রাশিয়ার উপর পশ্চিমি দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের পরিকাঠামোতে বদল আসে। সেই সময় থেকেই তুলনামূলক কম দামে রুশ তেল কিনছে ভারত। ফলে দেশের তেল শোধনাগারগুলির কাঁচামালের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। সরবরাহও নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ক্রুডের দাম কিছুটা কমলেও, ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলির কাছে রুশ তেল এখনও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক। কারণ, গত কয়েক বছরে রাশিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তারা।
দিল্লি-বনাম-ওয়াশিংটন নয়, বড় অর্থনৈতিক সমীকরণ আপনাদের হল, সমস্যাটা শুধু কূটনীতির নয়— এখানে জড়িয়ে রয়েছে জ্বালানি, বাণিজ্য ও ভারতের রফতানি। একদিকে রাশিয়ার তেল, অন্যদিকে আমেরিকার বাজার—দিল্লিকে দুই দিকের স্বার্থই সামলাতে হচ্ছে। বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, এই মার্কিন আইন ভারত-মার্কিন সম্পর্ক এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত তার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—রাশিয়ার তেল নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনাও চলছে। অর্থাৎ দিল্লির কৌশল হচ্ছে—চাপের মধ্যেও আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং একইসঙ্গে নিজের স্বার্থ স্পষ্ট করা। জয়শঙ্কর-রুবিও বৈঠক দেখিয়ে দিল, রাশিয়ার তেল ইস্যু এখন ভারত-মার্কিন সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রশ্ন। ওয়াশিংটনের চাপ থাকবে, মস্কোর সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সম্পর্কও থাকবে—এই দুইয়ের মাঝেই দিল্লিকে নিজের স্বার্থের সমীকরণ তৈরি করতে হচ্ছে।
রাশিয়ার তেল নিয়ে চাপ বাড়ছে, আমেরিকার হাতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের ক্ষমতা—আর দিল্লির হাতে জাতীয় স্বার্থের যুক্তি। এখন দেখার, এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনে পরবর্তী চালটা কে দেয়— ওয়াশিংটন, নাকি নয়াদিল্লি?